আজকের নিরিখে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় – সোমাদ্রি সাহা

0

সাহিত্য সময়ের সাগরে বাংলার মতো ভালো ভাষায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এক উত্তাল সময়ে এসেছেন। লিখেছেন। ছাপ রেখেছেন। সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। টালমাটাল অবস্থায় রবি ঠাকুরও চলে গেলেন। ইউরোপে নাত্সী বাহিনীর শেষ প্রদীপ জ্বলছে। নেতাজি মানুষকে শেষ ল্যাপের ভিক্ট্রি সাইন দেখাচ্ছেন। নেহেরু, জিন্না প্রাদেশিক ভাবে সোচ্চার হচ্ছেন। ব্রিটিশরা বুঝে গেছে হিসেব নিকেষ। লর্ড রুপী মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তানের তুরুপের তাস সাজিয়ে নিচ্ছে। রেডিওতে জাগছে নতুন এক হাওয়া। গান্ধিজির তৈরি করা ভারত ছাড়ো স্লোগান। আর সেই সময় বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তরে সমগ্র ট্রেন্ডকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে বাংলা ভাষার। বিজনবাবু নবান্নের আলো যেন স্টেজের দুটো দিক দেখিয়ে দিচ্ছে। দূর দূরান্তে এক নতুন আভাস সূচিত হচ্ছে। সাহিত্যের বিশ্বায়ন রবি ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় অন্য ভাবে করেছিলেন, কিন্তু বিস্তৃত আকারে সীমিত পরিসর মুক্ত করে নতুন এক ক্রাইসিস দেখা গেল লেখায়। সাহিত্যে দেখা যেতে লাগল শ্রেণি বৈষম্য, মন্বন্তরের কবলিত মানুষ, জমিদার সন্তানদের রাজনীতির ট্রিক্সগুলো ব্যক্তিমানসের চেতনায় প্রবেশ করতে শুরু করে দিয়েছে। চল্লিশ দশকের আগে ট্রেন্ড ছিল ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিতে জীবনবোধ, জীবন চেতনায় স্ক্যান্ডানেভিয়ান সাহিত্যের বাইরের দিকটি অনুকরণে বিপুল চেষ্টা, সাহিত্যের কথা শ্লথ হয়েছিল অনেকটাই, ঠিক তখনই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে সাথেই গঙ্গোপাধ্যায় নারায়ণ মঞ্চে আনলেন নতুন এক মার্জিত শিক্ষা।
১৯৪২ সালের অগাস্ট আন্দোলন সংঘটিত হলেও পরের বছর দুর্ভিক্ষ বাংলার বুকে নেমে আসে। ঐতিহাসিকরা এই সময়কে বাংলার ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলে থাকেন। ঐ সময়টায় বাংলা সাহিত্যের ঔপন্যাসিকরা ব্যাপক রাজনৈতিক চেতনায় মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাই আমরা পেয়েছিলাম সতীনাথ ভাদুরীর ‘জাগরী’ (১৯৪৫),‘ঢোড়াই চরিত মানস’ (১৯৪৯), নবেন্দু ঘোষের ‘ডাক দিয়ে যাই’ (১৯৪৬), গোপাল হালদারের ‘তেরোশো পঞ্চাশ’ (১৯৪৫), সুবোধ ঘোষের ‘তিলাঞ্জলি’ (১৯৪৪) প্রভৃতি উপন্যাস। রাজনীতি সচেতন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৮-৭০) তখন জীবনের মধ্য গগনে। তারও বিভিন্ন উপন্যাসের চরিত্ররা ‘তিমিরতীর্থ’ (১৯৪৪), ‘মন্দ্রমুখর’ (১৯৪৫), ‘বৈতালিক’ (১৯৪৮) রাজনৈতিক কর্মপন্থার সচেতনতা বহন করেছে।
সাহিত্য হলো জীবন মন্থনজাত বিষামৃত। আর জীবনের গন্ডীতে রাজনৈতিক ছায়া তো সুচিন্তিত প্রকরণ নিয়েই প্রকাশিত হয়। সাহিত্যে সামাজিক মায়া-কায়া-ছায়া মিলে মিশে এক সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে যায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে। স্বতোত্সারিত এই সচেতন দৃষ্টিকলম সমকালীন সময়সীমাকে অনুধাবন করেই তা পৃষ্ঠা সৃজনে উপজীব্য করে তুলেছেন। বিজন ভট্টাচার্যের প্রেক্ষাপটেই তাই নিজের মতো করে অনস্বীকার্যভাবেই ছোটগল্পগুলিতে তত্কালীন সমাজ বৃক্ষরা উঠে এসেছিল।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে তাই শ্রেণি বৈষম্য ও মন্বন্তরের রাস্তাঘাট, মানুষের অসহায়তার স্টেশন চত্ত্বর, অন্নের হাহাকার তাই উঠে এসেছে। পৈশাচিক জীবন্ত করুণ ক্ষুধা বাংলা ব্যাপী জেগে তুলেছিল কলোবাজারীকে। শোষণের মুখ মহাজন। ঘুসখোর প্রশাসনের সহযোগিতাও বাদ যায়নি। কবলিত বাংলা ভূমি। একমুঠো অন্নের আশায় মানুষের ফ্রেমগুলো অসহনীয়, ক্ষুধাকে নিবৃত্তির জন্য বাটি ভর্তি ফ্যান, অসংখ্য মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষ রাস্তার বুকে আশ্রয় নিয়েছিল। ‘নবান্ন’ নাটকের কথা, ‘ফ্যান’ কবিতার কথা শৈশবের পাঠ্যপুস্তক থেকেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দু’হাজার আঠারোতেও। সমকালীন দুর্ভিভের প্রেক্ষিত তাই নারায়ণ কলমে পেয়েছি ‘নত্রুচরিত’ ‘দুঃশাসন’ ‘হাড়’ ‘ডিনার’ ‘ভাঙা চশমা’ প্রভৃতি ক্লাসিক ছোটগল্প। আমরা যে সময়ে আজ দাঁড়িয়ে, হয়তো সেই অর্থে দুর্ভিক্ষ নেই। এক শ্রেণির হাতে ক্রয় ক্ষমতা অনেকটাই বেশি কিন্তু একটা শূন্যস্থান ও শোষণের ভিন্ন রূপ আজও শ্রেণি বৈষম্য তৈরি করেই রেখেছে। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের ফিরে দেখা বাংলার রাস্তার মানুষের ফ্যান বাটি ফিরে আসে কোনও এক স্বপ্নে। ফ্লাইওভারের তলায় আজও কালো হাড়িতে ফ্যান এক ঝটকায় মনে করিয়ে দেয় সল্টলেকের রাস্তায় ঝুপড়ি থাকবে না। কষ্ট হয় অজস্র মানুষকে প্রতিদিন আসতে হয় রুটিরুজির জন্য লোকাল ট্রেনে। ডেনড্রাইট খাওয়া শিশুরা এখন রাস্তার নীল লাল মোড়ে বলে ধূপকাঠি কিনবে, প্রজাতন্ত্র বা স্বাধীনতা দিবসে অবশ্য ওরাই এনে দেয় পতাকা। দাম পায় দেশজ এক গন্ধের। যুগ বদলায়, শ্রেণি চেতনার পন্থারা রয়ে যায় দাস ক্যাপিটালেই বন্দি। মানুষ আইকনিক নাম নিয়ে এজেন্ট হয়ে ওঠে। দল টলে যায়। আর নিজের গাড়ি বাড়ি গুছিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করে সেই সমাজের নেতারা। দল বদলায়। দিন বদলায়। আর সাধারণের দল… একই ভাবে হাতে হাত রেখে প্রেম করে চলে। রবি ঠাকুর থাকলে হয়তো ‘ওরা কাজ করে’ দ্বিতীয় সংস্করণ লেখা হয়ে যেত। সেই একই তাগিদে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোকিত দৃষ্টি চেতনাই আজও হয়তো সত্য। আজকের গল্পে হয়তো সেই ক্রাইসিস নেই, তবু রয়েছে তো রূপান্তরিত ধর্ষণের রূপ। আলোচ্য হলো মানুষ সমাজে পণ্য। বেঁচে থাকার জন্য বেচে দিতে হচ্ছে নিজেকে। সামাজিক এক অবক্ষয়। না পারা মানুষের কথাই তো প্রাসঙ্গিক সাহিত্যে। পাঠক তো এসবই পড়তে চায়। এখানেই তো জীবনের আদ্যন্ত মজা। এক হাতে তাই পাঠক বই, অন্য চোখে জল আর আহা, উঁহু…। তবে নারায়ণ বাবু কোনও সহানুভূতির জন্য লেখেননি। লিখেছিলেন সামাজিক তাগিদে। আমি সেই সব তাগিদ মনে করি দিতে চাই, যারা কম সুদের চক্রব্যুহে আজ ফেসে গেছেন। তাদের ভবিষ্যৎ এই ব্ল্যাক মার্কেটের দালালি শেয়ার মার্কেট। দিতে হবে অর্জিত অর্থ। তারা বিয়া দিবে, নিজেরা হাজার হাজার কোটি টাকায় ফুর্তি কইব়্যা নিবে। আর আম জনতা…থাক অনেক বেশি রাজনৈতিক হয়ে যাচ্ছে। আসলে আমরা মধ্য মেধার বোকারা। বুঝি না বাংলাতে আজও ফ্রেম বদলায়নি। কেবল হোয়াইট ওয়াশের মল তৈরি হয়েছে। মানুষের রোজগার নেই। হাহাকার প্রচুর…যেমন এই সব পাওয়া, না-পাওয়া দেখতে পাই ‘হাড়’ গল্পে।
কলকাতার পটভূমিতে ‘হাড়’ গল্পটি। দুর্ভিক্ষের শূন্য আশ্রয়স্থানের ভিন্ন মাত্রা এই গল্পে। শ্রেণি বিভাজিত সমাজ স্তরের অভূতপূর্ব এক বৈপরীত্যের তুলিটান ক্যানভাসে উঠে এসেছে। দেশজ গন্ধ অতিক্রম করে বিশ্বচেতনার অনন্ত জীবনসত্যের পরিচায়ক এক পটপ্রাঞ্জল মূর্ত বিমূর্ত সত্যকে মিশিয়ে দিয়ে আলোকবর্ষ (উত্সারিত) প্রাণে। প্রাচুর্যস্ফীত শ্রেণির কাছে যা শৌখিনতা, যা একক ব্যক্তির স্বপ্ন আনন্দ, তাই দারিদ্র পীড়িত প্রাণেদের কাছে প্রাণ বাঁচানোর আশ্বাস। আসল চিত্রে কী হয়! কেন হয়! বস্তদৃষ্ট লেখক তাই তার লেখনিতে বৈষম্য কান্নাদের তুলে ধরেছেন ‘হাড়’ গল্পে। গল্প কথক চরিত্রকে আমরা দেখতে পাই প্রমথের ছেলে সম্বোধনে, নামহীন এক উত্তমপুরুষ।
পিতৃবন্ধু রায়বাহাদুর এইচ. এম. চ্যাটার্জী সাহেব লেখকের পিতা প্রমথ-র সঙ্গে ফরিদপুর ঈশান স্কুলে একসাথে পড়াশোনা করেছেন। এম.এ. পাস করে বেকারির জ্বালায় অস্থির হয়ে লেখক ছুটে এসেছে পিতৃবন্ধুর কাছে একটি চাকরি পাওয়ার আশায়। বিশাল সম্পদ, সমাজে তাঁর অপার প্রতিপত্তি। তাঁর ইচ্ছায় মুহূর্তে পূর্ণ হয়ে যেতে পারে লেখকের মনোবাসনা।
অথচ ভ্রমণবিলাসী চ্যাটার্জী সাহেব চাকরির সীমাবদ্ধতায় বিশ্বাসী নন। তাঁর মতে কলম পিষে জীবন নষ্ট করার কোনো মানেই নাকি হয় না। উমেদারি করে একটা কলম পেষার চাকরি জোগাড় করা হীনমন্যতার থেকে তিনি লেখককে বেরিয়ে আসতে বলেছেন। — ‘বী এ ম্যান মাই ফ্রেন্ড, বেরিয়ে, পড়ো অ্যাডভেঞ্চারে, চাকরি নাও অ্যাকটিভ সার্ভিসে, ভিড়ে পড়ো নেভিতে।’
এদিকে ঐ সময়ে সংসারের সব দায় দায়িত্ব লেখকের। ব্যক্তিগত ভালো-মন্দের ব্যাপারটা সেখানে যে গুরুত্বহীন হতে পারে এই বোধটাই চ্যাটার্জী সাহেবের ছিল না। তার ওপর লেখকের স্বভাব ভীরু প্রকৃতির, প্রচন্ড রকমের। স্বাভাবিক ভাবেই যুদ্ধের কথায় ভয় পান, সাইরেনের শব্দে চমকে ওঠেন, সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গকে তাঁর অসহ্য বলে মনে হয়। তাই এক্ষেত্রে মহাসাগর তাঁর কাছে বিলাসিতা। বোমারু বিমানের যাত্রী হয়ে শত্রু নিধনের চেষ্টা করাও তাঁর সাধারণ বাঙালি হিসেবে কোনও প্রকার সম্ভব নয়। মধ্যবিত্তের মানসিকতার মানুষ লেখক। ফলে রায়বাহাদুরের ভ্রমণ-বিলাস তাঁর চোখে কেবলই ভ্রমণ-আতঙ্ক।
রায়বাহাদুর না থেমে শুনিয়ে যান তাঁর দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা। তিনি লেখককে দেশভ্রমণে উৎসাহিত করতে চান। আর সেই সূত্রকে টেনে এনে তিনি দেখাতে শুরু করেন লেখককে তাঁর অসাধারণ সমস্ত কালেকশন। বর্ণনা করতে থাকেন তাঁর অভিজ্ঞতায় ধরা পড়া হাওয়াই-এর সেই হুলাহুলো ড্যান্স, স্টিভেনসন ব্যালেনটাইনের প্রবাল দ্বীপের দেশের কথা, ফিলিপাইনের জাদুবিদ্যার কথা।
লেখক চাকরির ব্যাপারে রায়বাহাদুরের একটা সম্মতির প্রত্যাশী। তাই নিরুপায় হয়ে বসে বসে এই সব শুনেই টাইম পাস করতে থাকেন। পঁচিশ টাকার যে টিউশনি তাঁর এখনকার রোজগার – সেই টিউশনি কামাই হয়ে যায় এই সব শুনতে গিয়ে। লেখক নিজে মন কষ্টেই থাকেন। এদিকে ছাত্রের পিতা মহাজন, একদিন না গেলেই মাইনে কেটে নেন – তারফলে বসে বসে মাইনে কাটার আশঙ্কা সত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে রায়বাহাদুরের মুখের দিকে তাকিয়ে কালেকশন দেখতে থাকেন।
রায়বাহাদুর ড্রয়ার থেকে বের করেন কালো ভেলভেটের একটা বাক্স। তারপর সে বাক্স লেখকের কাছে রেখে তার ঢাকনা খুলে ফেললেন। লেখক বিস্মিত হয়ে দেখলেন সেই বাক্সের মধ্যে রয়েছে কয়েকটি হাড়। এখানে লেখকের অসাধারণ প্রতীকী প্রয়োগ। কালো ভেলভেটের বাক্স আর কিছু নয় – এ দেশের কালো বেঁটে গরিব মানুষ- যাদের চামড়ার নিচে মিলবে এই হাড়। মন্বন্তরের বিপর্যয়ে নষ্ট করে চামড়ার ঢাকা তোলার দরকার হয়নি- বুক ঠেলে শরীর ঠেলে বেরিয়ে এসেছে সেই হাড়- যা একেবারেই ফেলনা ছিল কারণ হাড়গুলো এখনো যে শরীরে রয়েছে জড়িয়ে যার ভেতরে এখনো আছে প্রাণ। আর অন্যদিকে নম্বরের লেবেল লাগানো এই হাড়গুলো সেই সব মানুষের যারা সকলেই অতীতের রহস্যে ঢাকা। মনে হয় যেন এক পিরামিড রহস্য।
গল্পের বাস্তবতায় আমরা জানি অভিজ্ঞতার গল্প রসহীন অবস্থায় জমে না। তাই রায়বাহাদুর তাঁর রূপসী কন্যা ছবিকে চায়ের ব্যবস্থা করার জন্য ডাকলেন। গল্পের একঘেয়েমী একটু কমলো। শরীরে একটা দোলা দিয়ে সে ঢুকেই পিতৃ আদেশ শুনে বেরিয়ে গেল। রায়বাহাদুর বাক্স থেকে বের করলেন একটা হাড় – জানতে চাইলেন তার উৎস। এখানেও সেই প্রতীকী ব্যঞ্জনাই রয়েছে। রায়বাহাদুরের প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানান ওই হাড়টি গরিলার হাড় হতে পারে। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন রায়বাহাদুর বন্ধু-পুত্রের এহেন মূর্খতায়। শেষে তাঁকে এ ব্যাপারে জ্ঞান করানোর উদ্দেশ্যে জানান যে রোডেশিয়ান – যারা অর্ধেক গরিলা অর্ধেক মানুষ – তাদেরই হাড় এটি। সিণ্ডনাও দ্বীপে কাটাবাবু বলে জায়গা আছে একটা। তারই কাছাকাছি একটা গাঁয়ের সর্দারের কাছ থেকে এই হাড় আমি কিনেছিলাম। আর ঐ হাড়ের দাম নাকি পড়েছিল পাঁচ হাজার টাকা। ধাক্কাটা এখানেই, বৈপরীত্যের সংঘাতও এখানেই একদল মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় যন্ত্রণা-কাতর হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে- অর্থাভাবে তাদের পেটে দানাপানিও পড়ছে না, অন্য শ্রেণির দু-একজন মানুষ তাদের মনের সাধ পূরণের জন্য ইঞ্চি তিনেক লম্বা চ্যাপ্টা আকৃতির অনেকটা ছুরির ফলার মতো হাড় কিনেছে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে। সে হাড় আবার বিবর্ণ হয়ে হলুদ রং ধরেছে রায়বাহাদুরের বিকটাকার কুকুরগুলোর নোংরা দাঁতের মতো।
এই হাড়ের কাহিনি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরের শব্দ উত্তাল হয়ে উঠল। রায়বাহাদুর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন- জানালেন এই মানুষগুলো অসহ্য হয়ে উঠেছে তাঁর কাছে কারণ এরা খেতে পেলেও চিৎকার করে, খেতে না পেলে করে। এখন বোধহয় পার্কে এসেছে লঙ্গর খানা থেকে খাবার দিতে। অন্যের খাবার পাওয়ার আনন্দ অসহ্য যাঁর কাছে তাঁর কাছে এল খাবারের প্লেট। লেখককে প্লেট নিতে বললেন তিনি। লেখকও ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়েছিলেন। বিনাবাক্যে তিনি প্লেট নিয়ে খেতে শুরু করেন। খেতে খেতে মানস চক্ষে দেখতে পেলেন বাইরের চিৎকার করা জনতার গোগ্রাসে খিচুড়ি গেলার চিত্র। খিচুড়ির ডেলা গলায় আটকে তাদের চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে অথচ আবার খাবার জন্য তাদের ব্যাকুলতা। ফলে খাবার আসামাত্রই তা নিঃশেষ। এদিকে রায়বাহাদুরের ঘরের ভেতরে খাবারের অভাব নেই তাই খাওয়া হচ্ছে যে ঘাসের শিষ চিবানোর বিলাসে। এই ব্যাপারে রায়বাহাদুর-পক্ষের মতামত গবগব করে খেলে জীবনের এস্থেটিক আনন্দ যায় নষ্ট হয়ে।
শুধু হাড় নয়- তার অসাধারণত্ব যে তার মন্ত্রগুণে এরপর সে কথা ব্যক্ত হয়েছে। এই ছোট হাড় যে জাদুবিদ্যার গুণে অসাধ্য সাধন করত এ কথা ঘোষণার পরে রায়বাহাদুর জানতে চান লেখকের জাদুবিদ্যায় বিশ্বাস আছে কিনা। লেখক অর্ধসত্য উচ্চারণ করেন। কারণ শস্যশ্যামলা বাঙলা জাদুবিদ্যা ছাড়া ক্ষুধার্তের বাংলায় কোনোমতেই পরিবর্তিত হতে পারত না। দ্বিতীয় হাড়খানা তুলে নিয়ে জাদুবিদ্যার মাহাত্ম্য আরোপ করে রায়বাহাদুর জানালেন যে মন্ত্রপূত এই হাড়ের গুণেই তাহিতির আকাশে দেখা দিত কালো মেঘ। রক্তের মতো রাঙা হয়ে যেত সেই মেঘ। খ্যাপা বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের হলকা যেত বয়ে। আকাশ থেকে নেমে আসত টাটকা রক্তের তাজা ফোঁটা। লেখকের অস্বস্তির মাত্রা বাড়তে থাকে। সে ব্যাপারে উদাসীন রায়বাহাদুর জানান এই হাড়টির উৎস। হাড়টি আসলে একটি কুমারী মেয়ের। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় যে মেয়েকে পুজো করে বলি দেওয়ার সময় তাকে আধপোড়া করে সেই হাড় পোঁতা হয়েছিল মাটিতে। সাত বছর পর সেই হাড় মহাসমারোহে তুলে ফেরা হতো সমুদ্রে। সমুদ্রের তলা থেকে যে সেই হাড় তুলে আনতে পারত সেই হতো জাদুবিদ্যার মালিক। প্রেতাত্মারা তখন হতো তার বশ। তার হাতে ধুলোমুঠি হয়ে উঠত সোনা। হাড়ের স্বরূপ অন্য রূপের ইঙ্গিত করে ধনীর দুলাল যারা নিত্য কুকর্মে রত – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালোবাজারের সুযোগে লোহার কারবারি হয়ে সোনার খনির মালিক হয়ে উঠেছেন – তাদের লোভেই যে এ হাড় সৃষ্ট হয়েছে কোনো নারীর থেকে। কিংবা বলতে চেয়েছেন তিনি লোভী, ধনী, কুকর্মে লিপ্ত মানুষদের প্রাচীন প্রজাতির স্মারক হলো এই হাড়। সেই পথকে বরণ করে নিয়েছেন রায়বাহাদুর। কারণ একটাই, জাদুর গুণে যে ঐশ্বর্য পেতে চান তিনি মুঠোর মধ্যে এখনো তা তাঁর করায়ত্ত নয়। তার কারণ তিনি হাড় পেয়েছেন মন্ত্র পাননি। তাই যে হাড় আগে ছিল বিস্ময়কর কার্যের স্বর্গ উৎপাদনের হাতিয়ার, সে হাড় এখন প্রতীকি মনের সামগ্রী।
চাকরির ব্যাপারে নিরাশ হয়েই বিদায় নিতে হলো লেখককে। রাত্রিতে পথে নেমে তিনি উপলব্ধি করেন ঘরের ভেতর ও বাইরের পার্থক্য দৃশ্য। দেখলেন কাঠির মতো হাত-পা ওয়ালা একটা ছেলে বেলুনের মতো পেট তার- সে চুষছে একটা হাড়। প্রাণপণে চেষ্টা করছে তার থেকে কোনো রস বের করার। লেখকের মনে হলো এই হাড়ের সঙ্গে ঘরের ভেতরের হাড়ের একটা সাদৃশ্য রয়েছে। বৈসাদৃশ্য হলো এই ভেতরের হাড় শোষণের মন্ত্র প্রয়োগের গুণে কাজ করে একটা লেবেল সাঁটা অতীতের স্মৃতি হয়ে উঠেছে- আর বাইরের হাড়ে যুক্ত হচ্ছে কিছু না পাওয়ার জন্য মানুষের প্রতিবাদের বলিষ্ঠ ক্ষোভ। যে হাড় এসে পৌঁছেছে এইসব সাধারণ মানুষের হাতে সে হাড়ে নেই জীবনধারণের সামান্য রসদত্ত। তাই সংঘবদ্ধভাবে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে এই শুষ্ক হাড়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠার। হাড় হলো বিপ্লবের মেরুদণ্ড। সর্বহারার অস্তিত্ব। সব হারানো মানুষরা এসে দাঁড়ায় পাশাপাশি- উমেদারি করে চাকরি জোগাড়ের জন্য নয়- বাঁচার জন্য একসঙ্গে টিকে থাকার জন্য। কেননা বিশ্বপরিবেশ পরিবর্তনের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তারা বুঝেছে স্বপ্ন পূরণের মন্ত্র তাদের হাতেই রয়েছে যে মন্ত্রের নাম সংঘশক্তি। আর যে মন্ত্র যে আধার অসাধ্য সাধন করে তার নাম ‘হাড়’।
(গল্প কথনের অংশটি গুগুলের সাহায্য নেওয়া হয়েছে)
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হাড়’ গল্প সম্পর্কে সমালোচকের মন্তব্য উদ্ধৃতিযোগ্য : ‘হাড়’ গল্পের শুরুতে গল্পের আবহে সামাজিক বৈষম্য গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। লোহার ফটক, অ্যাসফল্টের চওড়া রাস্তা, কালো মার্বেল বাঁধানো সিঁড়ি, রঙিন কাচের জানালায় সিল্কের পর্দা, চীনামাটির টবে কম্পমান অর্কিড, গ্রান্ডিফ্লোরার উগ্র সুরভি; একটু দূরে মনোহরপুকুর পার্কের বুভুক্ষু কলোনি, কালো জিভ দিয়ে হাইড্রেনের জল চাটা, এক মুঠো ভাত আর এক খাবলা বাজরার জন্য আর্তনাদ, হানাহানি- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলকাতারই ছবি। দারিদ্র্য আর বিলাসিতার পরস্পর বিপরীতধর্মী এই ছবির মাধ্যমে লেখক গল্পের মূল সুরকে স্পষ্ট করে তুলেছেন। রায়বাহাদুরের বিচিত্র হাড়ের সংগ্রহ দেখানোর সময়ও মানুষের সম্পর্কে ধনীদের বিরক্তি আড়ালে থাকেনি ‘পার্কের ওই ডেসটিচ্যুটগুলোর জ্বালায় রাতে আর ঘুমানো যায় না।… খেতে না পেলে চিৎকার করবে, খেতে পেলেও তাই।’
রায়বাহাদুরের বাড়িতে চা খাওয়ার সময়ে বুভুক্ষুদের চিৎকার শুনে যুবকের মনে একটা তুলনা ভেসে আসে। গরিবের গপগপ করে গেলা, হুসহাস করে শব্দ করা যেমন স্থূল-গ্রাম্য, তেমনি মার্জিত সংযতভাবে চাপান, দাঁতের কোণে কেক কাটাকে ‘এসথেটিক’ মনে হয়। …জাদুবিদ্যার অসামান্য গুণে একটা কুমারী মেয়ের অস্থি প্রকৃতির অধীনশ্বর করে তোলার স্বপ্নের মধ্যে অবাস্তবতা অনেক। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে দারিদ্র্য ক্ষুধা শোষণের যন্ত্রণায় শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া অনেক বেশি স্বাভাবিক। কিন্তু সে সময় এখন আসেনি যখন বিপ্লবের মহান মন্ত্র ওই সর্বহারা মানুষকে শ্রেণিচেতনায় উদ্দীপ্ত করবে। গল্পটির এই পরিণামী সাদৃশ্য ধারণা এবং শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক প্রবল সদর্থক জিজ্ঞাসায় উন্নীত হয়েছে।’ ‘আদ্যন্ত এ গল্প ব্যঙ্গাত্মক। সভ্যতাগর্বী বিকারগ্রস্ত ধনতন্ত্রের প্রতি এ গল্পে যেন নির্মম কশাঘাত করেন লেখক। উপসংহার চমকদীপ্ত। ‘হাড়’ প্রতীকী তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়। মন্বন্তরের বলি হয় অসংখ্য মানুষ। সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র রাজধানী শহর কলকাতার বুকে পুঞ্জীভূত হয় হাড়ের স্তূপ। রায়বাহাদুরের মতো বিত্তবান অভিজাত শ্রেণির বিবেকের দরজা বন্ধ থাকে। বুভুক্ষু মানুষের অবস্থার কি পরিবর্তন ঘটবে না? এই চিন্তা আজও সত্য। এখনও মানুষের চাকরির জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম, সেই পরিমাণ রোজগার নেই। অমানবিক চিত্র আমরা দেখতে পাই গল্পের প্রতিটি অংশে –
‘সমানে ডাস্টবিন। পাশের অবগুন্ঠিত ল্যাম্পপোস্ট থেকে একটা ছোট আলোক চক্র পড়েছে তার উপর। তিন-চারজন অমানুষিক মানুষ তার ভিতর হাত ডুবিয়ে খুঁজছে খাদ্য। একটু দূরেই একটা কঙ্কালসার কুকুরের ছায়ামূর্তি – নতুন প্রতিযোগিদের কাছে ভিড়বার সাহস পাচ্ছে না। কাটির মতো হাত-পা আর বেলুনের মতো পেটওয়ালা একটা ছোট ছেলে দু-হাতে কি চুষছে প্রাণপণে। হাড়? হ্যাঁ হাড়ই তো।’
আবার যখন তাহিতি দ্বীপের কুমারী মেয়েকে পুড়িয়ে সেই হাড়ের উপখ্যান তুলে ধরছেন তখন গল্প কথকের শিহরণ হচ্ছে ‘তাহিতি দ্বীপে মানুষ পুড়ছে না, পুড়ছে কলকাতায়।’ আসলে লেখক এখানে অভাবনীয় অপেক্ষ্যমান ভয়ংকর ভবিষ্যতের কথাই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর এই ভয় আজও আমার এই লেখাটি লেখার সময়ও সত্য। আমরা লেখকের ‘নত্রুচরিত ও দুঃশাসন’ গল্পেও বিপ্লব ও অসন্তোষের ইঙ্গিত পেয়েছি। গল্প কথক উমেদার চাকরি প্রত্যাশী এক নতুন আলোর কথাই বলেছেন –
‘আমি থমকে দাঁড়ালাম কোথায় একটা সাদৃশ্য বোধ সেই বলি দেওয়া কুমারী মেয়ের হাড়খানার মতোই দেখতে। যার গুণে তাহিতির আকাশে রুধিরক্ত মেঘ ভেসে উঠেস ঝড়ের সঙ্গে আগুনের ঝাপটা বয়ে যায়, ঝর ঝর করে ঝরে তাজা রক্তের বৃষ্টি। কলকাতার আকাশে ও কি মেঘ করেছে ভালো করে তারাগুলোকে দেখতে পাচ্ছি না? ওই কালো রঙের আকাশের রঙ আগুনের মত লাল হয়ে উঠবে, এই ম্যালেরিয়া গন্ধ-জড়িত মিটে হাওয়ায় ঝরো আগুনের ঝলক কবে লকলক করে বয়ে যাবে?’
ব্যঞ্জনাধর্মী অবাক এক লেখনি। ভয়ংকর সত্য। যা আজ আমেরিকা সৃষ্ট তেলের লড়াইয়ে সত্য। মধ্যপ্রাচ্য। সিরিয়া, আফগানিস্তান। উফ। নরখাদক তো মানুষই। যা আমরা এই গল্পের শেষে খুঁজে পাই ‘হাড় ওরা পেয়েছে কেবল মন্ত্র পাওয়াটাই বাকী।’ বর্ণনাধর্মীতার এই অমোঘ টানে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প বা অন্যান্য সৃষ্টি আমাদের টেনে আনে। সজীব চিত্র আজও মনে হয় রয়েছে, মনোহরপুকুরের বস্তিতে। মিড ডে মিলের শিশুরা তো আসলে মিল খাচ্ছে। নিজেরাই হাড় হয়ে উঠছে। গভীরতাহীন এক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে যুব। শ্রী সেখানে ম্লান। তবু পোস্টারে রয়েছে সবটাই ওখানের দুগ্গা পুজোতে। উত্সব হচ্ছে। সেই সব মিলেই নারায়ণ কলমে চরিত্রের অন্তর্মুখীন ভাবনা ও ভবিষ্যতের ভয়াবহ ফোকাস ক্যানভাস আমাদের মানুষ আদর্শকে দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। তাই ‘বর্ষাযাপন’ রবি ঠাকুরের লেখায় ‘নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ’ টাইপের মতো করেই সীমিত পরিসরে শিল্পকুশলতাকে প্রয়োগ করে দি এন্ড টেনেছেন। বিভত্স এক বিনির্মাণ আমরা উত্তর আধুনিক সময়েও দেখতে পাই।
নিউ হিস্টরিসিজম ও ডিকনস্ট্রাকশন দৃষ্টিভঙ্গিতে নারায়ণ বাবুর হাড় গল্পটি
নিউ হিস্টরিসিজমের মতো ডিকনস্ট্রাকশনও একটা লেখার একাধিক অর্থ অন্বেষণ করে। তাই উপরের ঘটনাকালকে বর্তমানের অবস্থান থেকে দাঁড়িয়ে অতীতকে দেখা নিউ হিস্টরিসিজমের একটা ধরন। মনট্রুস, গ্রিনব্লাট ছাড়াও মিশেল ফুকো নিউ হিস্টরিসিজম বিকাশে বিরাট ভূমিকা রেখে ছিলেন। ফুকো বলেন ক্ষমতা বিভিন্নভাবে বিচ্ছুরিত হয়- প্রশাসন যন্ত্র থেকে চার্চ, অফিস, স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত সব প্রতিষ্ঠানই ক্ষমতা প্রকাশ করে- ইতিহাসের একেকটা সময় এই রকম বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার প্রকাশ করে থাকে। আর বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা ইতিহাসকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। কার্ল মার্কসের তত্ত্বও নিউ হিস্টরিসিজমে বিশেষ প্রভাব ফেলে। তার সুপারস্ট্র্রাকচার যেখানে সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক শক্তি কাঠামো, রীতিনীতি এবং পুরো দেশ জড়িত। এখানেই দুর্ভিক্ষের সমকালীন বিচার দরকার। আসলে কালো বাজারি সব সময়ই সমাজে নানারকম ভাবে থাকে। আগে সরাসরি হতো, এখন ঘুরিয়ে হয়। আসলে এই সমস্ত নিয়ামকগুলো খুব সহজে টেনে বের করতে পারি আর তা নিউ হিস্টরিসিজম তত্ত্ব দাঁড় করাতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। সাহিত্যের সাথে ঐতিহাসিক দৃষ্টি দিয়ে ঘটনাকে বিবেচনা ও ইতিহাসকে সাহিত্যের দিক দিয়ে বিবেচনা নিউ হিস্টরিসিজমের বৈশিষ্ট্য। কারণ বাংলায় মন্বন্তরের ঐ সময়ের ঐতিহাসিক বই ও সংবাদপত্র লেখকের মনের সচেতন, অবেচেতন দুটো ব্যাপারকেই নিউ হিস্টরিসিজম গণ্য করে। এটি ফসিলের মতো কোন বই থেকে সাহিত্য, সাংস্কৃতিক অবস্থা, নৃ-তত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি বা যা ইচ্ছা তাই বের করে আনতে পারে। এমনিভাবে নতুন করে আমরা বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে দুর্ভিক্ষকে পর্যালোচনা করতেই পারি। মনট্রুস সাহিত্য ও ইতিহাসের সম্পর্কে এই ধারণা দিয়ে ছিলেন তবে নির্দ্বিধায় এ কথা বলা যায় যে নিউ হিস্টরিসিজমের প্রসারে ও জনপ্রিয়তায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন স্টিফেন গ্রিনব্লাট। তিনি বলেছেন একটা ইতিহাসের বইকে আমরা যদি সঠিকভাবে জানতে চাই তবে তার সাহিত্যিক মূল্য বিবেচনা করতে হবে। লেখকের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার, তার পারিপার্শ্বিকতা, তার মনোবৈজ্ঞানিক চিন্তা, ঐ সময়ের পরিস্থিতি সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাপার কতটা এই বইয়ের উপর প্রভাব ফেলে ছিলো তাও বিবেচনায় আনতে হবে। ঠিক সেখান থেকে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয় দুর্ভিক্ষের চিত্র কতটা ভয়াবহ তা আমরা অনুধাবন করতেই পারি না। আর শ্রেণিতে যারা উপরের সারিতে তারা এইসব পাত্তা দেয় না। গরীবি কি সত্যই হাটিয়ে দেওয়া যায়। দেশের ভ্রষ্টাচার হাটানো যায় কি…নায়ক সিনেমার মতো প্রধানমন্ত্রী ও দুর্নীতি হাটিয়ে চিটফান্ড মুক্তো দেশ হবে, এটা ভাবাই মনে হয় বোকামো। এ দেশে কিছুটা আনন্দ দিয়ে দেয় মাঝে মধ্যে। তারপর শুষে খাওয়া সমাজ। সমাজ মানে এখানে শিল্পপতিদের পোট্রে করছি।
ইতিহাস যা লেখা হয় তা হলো রাজাদের ইতিহাস; নিপীড়িতের ও বঞ্চিতের যে ইতিহাস থাকতে পারে তা প্রশাসন যন্ত্র থেকে সাহিত্য সমালোচনা আমলে আনে না। তাই স্টিফেন গ্রিনব্লাট বলেছেন কোন সময়ের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ঐ সময়ের পুরো ইতিহাসকে খুঁড়ে আনতে হবে। ঐ সময়ের যতো প্রমাণ, দলিল-দস্তাবেজ আছে তাও বিবেচনায় আনতে হবে। এই গল্পে আমরা দেখতে পাই যা দেখিয়েছেন, তা আজও শোষণ যন্ত্রে সত্য।
নিউ হিস্টরিসিজমের প্রধান সাফল্য হচ্ছে যে এটি অনেক নতুন চিন্তা অনেক নতুন ইজমকে একত্রিত করতে পেরেছে। যেমন মার্কসিজম, ফেমিনিজম, ডিকনস্ট্রাকশন থিওরি, অবকাঠামোবাদ, উত্তর-অবকাঠামোবাদ এগুলো সবগুলোকে নিউ হিস্টরিসিজম এর আওতায় আনতে সক্ষম। শোষণ তত্ত্বের কালোবাজারি, সুন্দর বাড়িতে বেঁচে থাকা মানুষের গল্প, বেকারের চাকরি, সংসার চালানো কতটা কঠিন তা জ্যাক দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন থিওরি বিশেষভাবে নিউ হিস্টরিসিজমে প্রভাব ফেলেছে। ডিকনস্ট্রাকশন বা বিনির্মাণ থিওরিতে আমরা তাই বুঝি এই সময় আজও রয়েছে। এখন শুধু চোখ ভোলানোর মতো করে খুব অল্প মাইনের চাকরি দিয়ে একটা সমাজকে শেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। মানুষকে মূর্খ করে রাখার জন্য অর্ধ ও নগ্ন শিক্ষায় শিক্ষিত করা হচ্ছে। মানুষকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। সেখানে হাড় গল্পটি সত্য। বেকার চাকরি চায়। অন্ন চায়। সে গল্প শুনে বাঁচতে চায় না।
শোষিত, নারী, কালো, দাস, বন্দি, বিপথগামীদের সাথে কেমনভাবে একটা সমাজ আচরণ করত তাও সেই সময়কার ইতিহাসের অংশ যার ওপর নিউ হিস্টরিসিজম জোর দিয়ে থাকে। কারণ নির্যাতিতের কথা ইতিহাস লিখে রাখে না শুধু বিজয়ীদের কথা ইতিহাসে জনপ্রিয়তা পায়। এটা বিশেষ করে এশিয়া ও ইয়োরোপীয় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মাঝে দেখা যায়। যেমন জোসেফ কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস’ এ প্রাথমিক পঠনে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে ইয়োরোপীয় অসভ্য, বর্বর কঙ্গোবাসীকে সভ্য করতে, শিক্ষা দিতে আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছল; কিন্তু আমরা যদি অন্য আরেকদিক থেকে লক্ষ্য করি তবে দেখতে পারি হার্ট অব ডার্কনেস’ এর আলোকে ইয়োরোপীয়রা যত না সভ্য হিসেবে অসভ্য আফ্রিকানদের শিক্ষা দিতে গিয়ে ছিলো তারচেয়ে বেশি ছিলো পশ্চিমাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ আর আফ্রিকার সম্পদের প্রতি লোভ। দাসত্ব ও আধিপত্যবাদের এক মর্মন্তুদ চিত্র ধরা পড়ে হার্ট অব ডার্কনেস’ উপন্যাসে। ম্যানেজার, কার্টজ, বেলজিয়ান কোম্পানি এরা সবাই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এভাবে নিউ হিস্টরিসিজম দৃষ্টিকোণে যেটা কিছুটা বিনির্মাণের মতো, কুখ্যাত- কলোনিয়ালিজমের একটা ভয়াবহ অজানা চিত্র তুলে আনা যায়।
ক্ষমতার লোভ আগেও ছিলো আজও রয়েছে। আর সেই ভোগ কতটা বাজে ভাবে প্রভাব ফেলছে, সেলফি সমাজের কাছে তা তো আমাদেরই বুঝতে হবে। না বুঝলে এই কালজয়ী গল্পরা তো চুপ করে যাবে। তাই যাতে সমাজ আরও একবার লেখকের একশো তম বর্ষে জেগে ওঠে তার জন্যই নতুন করে এক চেষ্টা। না হলে বাঙালি হিসেবে নিজেকে বেচে দিতে হবে আবহমান কালের কাছে… আসলে আমরাতো কিছুই নিয়ে আসিনি, কিছুই নিয়ে যাবো না, জীবনের ভাগফল তাই মিলবে না, পরে থাকবে ভাগশেষ…

Leave a Reply

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: