কচ্ছপের বেঁচে থাকা – দেবব্রত সান্যাল (সপ্তম কিস্তি)

নিকলের নিয়োগপত্র বার পাঁচেক খুঁটিয়ে পড়ে নিশ্চিন্ত হয়ে, আমার টুইডের কোটটা গায়ে দিয়ে অফিসে গেলাম। আবহাওয়াটা মোটেই কোট পরার পক্ষে উপযুক্ত নয়। অফিসে বেশি ফিটফাট হয়ে আসাটা দত্তসাহেবের চক্ষুশুল, তাই কসরত করে টাই লাগাতেও ভুললাম না। শিয়ালদায় জুতোটাকে ক্রিম পালিশ করিয়েও সবার আগে অফিসে এসে, নিজের চেয়ারে বসলাম। মুখটাকে যথা সম্ভব ভাবলেশহীন করে রাখলাম। পদত্যাগ পত্রে গোটা গোটা করে তারিখ বসিয়ে সই করে রাখলাম। একটা কপি করে রাখলে ভালো ছিল। যাকগে, জীবনে বেশি প্ল্যানিং করলে আসল কাজ কেঁচে যায়। আমাকে কিছুটা অস্থির করে আজ মিঃ দত্ত দেরি করে অফিস এলেন, আমি চা খেতে খেতে সংলাপগুলো শেষ বারের মতো ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম, হঠাৎ ভিতরে ডাক পড়লো। এমনটা একদম আশা করিনি। ভালোই হলো, কী ভাবে দত্তসাহেবের চেম্বারে ঢুকবো সে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আমাকে বসতে বলে, এতদিন ধরে যেন কিছুই হয়নি ভান করে, দত্তসাহেব চন্দ্রপুরায় ট্যুরে যেতে বললেন। আমি ধৈর্য সহকারে ওনার সবটা শোনার পর পকেট থেকে পিস্তল বের করছি এমন ভাব করে পদত্যাগ পত্রটা বের করে ওনার হাতে দিলাম। এমন আনন্দের মুহূর্ত জীবনে কবার এসেছে বলা কঠিন। এই কিছু না বলে, কিছু হয়নি ভাব করে, পদত্যাগ পত্রটা দেবার সিনটা আমার ভেবে রাখা নাটকীয় সংলাপের চেয়ে ঢের ভালো নামলো। এমন সিন শুধু আইজেনস্টাইনের হাত দিয়েই বের হয় বস। বছরখানেক আগে প্রবীরের বোন আমাকে একান্তে ডেকে বার্ণিকে প্রকাশিত আমার লেখার প্রচুর প্রশংসা করে ‘মেঘের কালিতে বুড়ো আঙ্গুল ডুবিয়ে’ কার ছবি আঁকতে চেয়েছি জানতে চেয়েছিল। সে এক ব্যাপার। তুলনা করা উচিত নয় জেনেও বলি, আজকের আনন্দটাকেই আমার প্রথমস্থানে বসানোর ইচ্ছে। ছবি আঁকতে জানি না, সাথে ক্যামেরাও নেই আক্ষেপটা থেকেই যাবে, মিঃ দত্তের মুখখানা দেখবার মতো হয়েছিল। শেষ চেষ্টা করে বললেন, ‘যদি রেজিগনেশন অ্যাকসেপ্ট না করি?’ রঞ্জিত মল্লিক মার্কা হাসি দিয়ে বললাম, ‘সে চেষ্টাটাও করে দেখে নিন। ভেবেছিলাম আর দেখা হবে না, এখন মনে হচ্ছে কোর্টে দেখা হবে।’

অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে পরের দিনের দার্জিলিং মেলের টিকিট কেনার সাথে সবার জন্য একবাক্স সন্দেশ কিনলাম। আহমেদের হাতে দিয়ে বললাম ‘সবাইকে দিয়ে এসো, দাস ম্যাডামকে দুটো।’ মিত্র নিচু গলায় বলল, ‘যা হলো তোমার জন্য ভালোই হলো। আমাদের ভুল বুঝো না, ভুলে যেও না ভাই।’

পরের দিন দরকার ছিলো না, তবু আটটা তেরোর ট্রেনটা ধরলাম। অনেক সাহস জমা করে, নাম না জানা সেই সহযাত্রী মেয়েটির কাছে গিয়ে বললাম, ‘আজ আমার এখানে শেষ দিন।’

মেয়েটি অবাক হলেও ততটা বুঝতে দিলোনা। ‘কলকাতার বাইরে যাচ্ছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ভালো থাকবেন।’

‘আপনিও।’ ট্রেনটা শিয়ালদায় ঢুকে পড়লো।  

জলপাইগুড়িতে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের কাউকেই বিশেষ পেলাম না। পাওয়ার কথাও নয়। সবাই চাকরির সূত্রে জলপাইগুড়ির বাইরে। গরম পড়ে গেছে। করলা নদীর ব্রীজে আমাদের ঠেকে এখন অন্যরা দাঁড়াচ্ছে। শুনলাম কাকলির মা হঠাৎ করে মারা গেছেন। খুব ইচ্ছে করছিলো ওদের বাড়ি গিয়ে একবার দেখা করি, পাশে গিয়ে দাঁড়াই। নাই বা হলাম কেউ, তবুও কি এই আকাশ ভাঙা শোকের সময় সামান্য সান্ত্বনা দিতে পারবো না? কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশি ভাবলে সেটা করে ওঠা হয়না, এই দেখাটাও করা হলো না। যে কাজটা আগে কখনো করিনি এবার তাই করলাম। পুরো সময়টাই বাড়িতে দিলাম। মা বাবার সাথে গল্প করলাম। বাজার করলাম, জলের কল সারালাম, লাইট ঠিক করলাম, ফিল্টার পরিষ্কার করলাম, এরকম আরও কত কী! কিছু পুরোনো বই আবার পড়লাম। সব মিলিয়ে ভালোই সময় কেটে গেলো। শেষের কদিন ওখানে বসে যখন নিকলে যোগ দেবার জন্য তৈরি হচ্ছি, তখন খবরের কাগজে দেখি বিরাট হৈ চৈ। বিদেশের হয়ে চরবৃত্তি করতে গিয়ে এন.টি.ইন্ডাস্ট্রীস লিমিটেডের অনেক কর্তা ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার, কলকাতা অফিসের সুবীর দত্তকেও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

()

সুবোধ চক্রবর্তী হলে জলপাইগুড়ি থেকে কুদ্রেমুখে যাওয়া নিয়ে শ’দেড়েক পাতার ভ্রমণ কাহিনি তো লিখেই ফেলতেন। শুনেছি উনি নাকি বিশেষ কোথাও না গিয়েই অনেক কটা মোটা মোটা ভ্রমণ কাহিনি লিখেছিলেন। বেশ বুদ্ধির কাজ করেছেন, ভ্রমণ করলে লোকে এমন নাকাল হয় যে কাহিনি লেখার মতো শক্তি আর অবশিষ্ট থাকে না। এমন লম্বা সফর আমি আগে কখনও করিনি। বিকেল পাঁচটায় জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে দার্জিলিং মেলে চেপে পরদিন সকাল আটটা নাগাদ শিয়ালদায়। পরের ট্রেন, হাওড়া ম্যাড্রাস মেল সন্ধে আটটায়। সাথে মাল নিয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়, তাই শিয়ালদার কাছে এক লজে মাথা গুঁজলাম। এন.টি র দৌলতে এই এগারো মাসে ভালো হোটেলে থাকার বদভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিজের গাঁটের পয়সায় যেখানে উঠলাম তার সবকিছু এমন খেলো আর নোংরা লাগতে লাগতে যে বেশিক্ষণ টিকতে না পেরে ট্রেন ছাড়ার ঘন্টা তিনেক আগেই হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। হাওড়া স্টেশনও তেমন মনোরম কিছু নয়, খাওয়ার কিচ্ছু পাওয়াও যায় না। খাবার তো না হয় ট্রেনেই পাওয়া যাবে কিন্তু লম্বা রাস্তা, হাওড়া থেকে বই কিনতে ভুলে গেলে সর্বনাশ। খড়গপুর দিয়ে উড়িষ্যার বুক চিরে অন্ধ্রপ্রদেশ পেরিয়ে তারপর ম্যাড্রাস সেন্ট্রাল। একই ট্রেনে দুই রাত। ট্রেনে জল এবং পরিচ্ছন্নতার অভাব কষ্টদায়ক, তার ওপর খাওয়ার যা পাওয়া যাচ্ছিলো তা জিভের সেন্সার বোর্ডে পার হয়ে গলা পর্যন্ত যাবার ছাড়পত্র পাচ্ছিলো না। পথে মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা পার হয়ে আসতে হয়। অন্য এক জোড়া ট্রেনও কিন্তু ছিল যেগুলো গৌহাটি থেকে কোচিন নয়তো ত্রিবান্দ্রম যায়, পালঘাটে ট্রেন বদল করে নিতে হয়। ওতে চাপলে কলকাতায় নামতেই হতো না, ম্যাড্রাসেও না। কিন্তু ট্রেনগুলোকে কেউই গুড কন্ডাক্টের সার্টিফিকেট দিল না। চব্বিশ ঘন্টা দেরি নাকি রোজকার গল্প।

ম্যাড্রাসে একটু দেরিতে পৌঁছালে ক্ষতি ছিল না বরং ভালই হতো, কারণ পরের ট্রেন ম্যাড্রাস ম্যাঙ্গালোর ওয়েস্ট কোস্ট দুপুর বারোটায়। দরকার না থাকলেও নির্ধারিত সময়ের কুড়ি মিনিট আগেই ম্যাড্রাসে পৌঁছে বসে থাকলাম। ম্যাড্রাসের ওয়েটিং রুম প্লাটফর্মের চেয়ে বেশি উন্নত কিছু না। বেঞ্চে, মেঝেতে সর্বত্র হয় মালপত্র রাখা নয় কেউ শুয়ে আছে। আবার কেউ কেউ অন্য সবার উপস্থিতি ভুলে তোয়ালে পড়ে ভেজা চুল থেকে জল ছেটাচ্ছে। হাঁউমাউ করে কী ভাষায় কী যে ঘোষণা হচ্ছে বোধগম্য নয়। জলখাবার ঠান্ডা ঠান্ডা টক নেতানো দোসা আর প্রচুর চিনি দেওয়া কফি নামক ঠোঁট পোড়ানো তরল পদার্থ। এসব দেখার পরও রাংতায় মোড়া বিরিয়ানি কিনে ট্রেনে ওঠা যে বুদ্ধির পরিচয় হয়নি তা রাংতার মোড়ক খুলে টের পেলাম।

ওয়েস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস বেশিটাই কেরালার ওপর দিয়ে যায়, তাই মালয়ালি যাত্রী বেশি। আমার সাথে এক মালয়ালি পরিবার উঠেছিল। ভদ্রলোক চল্লিশের কাছে বয়েস, পরনে সাদা ধুতির মতো লুঙ্গির ওপর সাদা হাফ শার্ট। স্ত্রীর বয়েস অনুধাবন করার জন্য যতটা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন, সেটা তাঁর পতি নামক দেহরক্ষীর নিরীক্ষণে সম্ভব নয়। স্ত্রী জরি বসানো শাড়ি পড়ে, মাথায় চপচপে করে মাখা নারকোল তেলের ওপর সাদা ফুল লাগিয়ে দুটো বাচ্চা ছেলেকে কিছু না কিছু খাবার সাপ্লাই করে যাচ্ছেন। ছেলে দুটোও রামেশ্বরম থেকে লঙ্কা লাফালাফি করার ফাঁকে সেগুলো সমানভাবে খেয়ে ও ছিটিয়ে চলেছে। ভদ্রলোক মাতৃভূমি পড়ার ফাঁকে খেয়াল রাখছিলেন আমি যেন ওনার স্ত্রীর পাশে না বসে পড়ি। রাতে বললেন উপরের বার্থে চলে যান এখানে আমার স্ত্রী শোবেন। পরে বুঝলাম ওনার স্ত্রী মোটেও আমার খালি করে দেওয়া বার্থে শোবেন না। ভদ্রলোক চান না, আমি ওনার স্ত্রীর মুখোমুখি বার্থে ঘুমাই।

ম্যাঙ্গালোর স্টেশনে যখন ট্রেন ঢুকছে তখনও ভোর ছটা বাজতে মিনিট পনেরো বাকি। জলপাইগুড়িতে এই সময়টা সবার করলার বাঁধে প্রাতঃভ্রমণ করে ফিরে আসার সময়। ওয়েস্টকোস্ট এক্সপ্রেসের পূর্ণ বিরাম ম্যাঙ্গালোর জংশনে। তাই নামার তাড়া নেই। পথে অনেকেই নেমে গিয়ে ট্রেনটাকে খালি করে গিয়েছে। সেই মালয়ালি পরিবারও। আমি প্রায় ঘন্টা খানেক আগে থেকে উঠে তৈরি হচ্ছি। কেরালার সীমা পার হয়ে বেশিক্ষণ হয়নি। নেত্রাবতী নদীর ওপর একটা বড় ব্রীজ পার করে ট্রেনটা ম্যাঙ্গালোর স্টেশানে ঢুকতে শুরু করল। ম্যাঙ্গালোর স্টেশনটি আশানুসারে ছোট, প্লাটফমের সংখ্যা কম ও প্রায়শঃই সংস্কারপ্রার্থী। নিচু প্ল্যাটফর্ম, এবড়ো খেবড়ো কংক্রিট, আমার সুটকেসের চাকা হোঁচট খেতে খেতে চলল, কখনো আমিও। স্টেশনে লাল জামা পড়া সহায়তা করার মত কাউকে চোখে পড়লো না। আমার মালপত্রও এমন বেশি কিছু নয় যে সাহায্য নিতে হবে। স্টেশনে টিকিট চেকিং এর বালাই নেই, স্টেশনের বাইরে বের হয়ে এসে দেখি লাইন দিয়ে কালো হলুদ অটো দাঁড়িয়ে। কারোর গাড়িতেই মিটার বলে কোনও বস্তু নেই, আর বাস স্ট্যান্ড পৌঁছে দিতে সর্বনিম্ন দাবি চার টাকা। চড়ে বুঝলাম না চড়লেও ক্ষতি ছিল না। বাসস্ট্যান্ড অটোতে এক মিনিটের পথ, অজ্ঞতার মাসুল তো সব জায়গাতেই দিতে হয়, ম্যাঙ্গালোরই বা ব্যতিক্রম কেন হবে।

বাসস্ট্যান্ডে মাছের বাজারের চেয়ে বেশি হই চই। কথাটি আক্ষরিক অর্থে সত্যি, কারণ এরপর যখন স্বচক্ষে ম্যাঙ্গালোরের মাছের বাজার দেখেছিলাম তখন বুঝেছিলাম যে মাছটা শান্ত থেকেও কেনা যায়। চতুর্দিকে থেমে থাকা বাসের ইঞ্জিনের গোঙানি, এগোতে চাওয়া বাসের হর্নের শাসানি, যাত্রীদের উচ্চস্বরে প্রশ্নাবলী আর পরস্পর সচিৎকার ভাব বিনিময় ও তদুপরি কন্ডাকটরদের উদাত্ত আহ্বান, সবমিলে এক অসুর ঐক্যতান। কন্ডাক্টররা প্রায় সবাই হাল্কা রঙের শার্টের তলে সাদা লুঙ্গি বিপদজনক ভাবে ভাঁজ করে জড়িয়ে নিয়ে আপ্রাণ গন্তব্যস্থলের নাম ঘোষণা করে যাচ্ছে। অনেক কান পেতেও কুদ্রেমুখ নামটা শুনতে পেলাম না। একটু বেশি উদ্যোগী হতেই হলো। অতঃপর যাকেই জিজ্ঞাসা করি বাসটা কী কুদ্রেমুখ যাবে? মাথাখানা ডাইনে বাঁয়ে নাড়াচ্ছে। তৃতীয়বারেও একই উত্তর পেয়ে কী করবো ভাবছিলাম। ‘তুমি কি কুদ্রেমুখ যাচ্ছো’ (পিছন থেকে আওয়াজটা ইংরেজিতে এবং পুরুষ কণ্ঠে হলেও আমার তখন কপালকুন্ডলার কথা মনে পড়লো) । ঘুরে দেখি আমারি বয়েসী, প্যান্ট শার্ট পরা একজন ছেলে। চোখে ভালো ছেলে সুলভ চশমা। কোঁকড়া চুল এবং কাঁচা-পাকা হলেও বয়েস বাড়ায় না।

‘অবশ্যই যেতে চাই, কিন্তু কোনটা যে সঠিক বাস বুঝতে পারছি না।’

‘এই বাসটাও যাবে, তবে এর ডান দিকেরটা প্রথমে ছাড়বে। হাই, আমার নাম বি. নন্দকুমার গন্তব্যস্থল একই।’ নন্দকুমার মাইসোরের ছেলে, আমারই সাথে নিকলে জী.ই.টি হিসেবে যোগ দিতে কুদ্রেমুখে যাচ্ছে। ও নাকি আমাকে ইন্টারভিউ-এর সময় দেখেছে। নন্দকুমারের সাথে ভাঁজ করা খাট, বিছানা, অনেক কিছু। বাস কন্ডাক্টারদের সাথে কথা বলতেই তারা অভ্যস্ত নৈপুণ্যে সব সমেত বাসের মাথায় চাপিয়ে দিলো। দুজনে পাশাপাশি বসলাম। নন্দকুমার বাঙালিদের সম্বন্ধে যে অনেক কিছু জানে সেটা প্রমাণ করতে লেগে গেলো। বাঙালিরা যে অন্তস্থ ব উচ্চারণ করতে পারে না। ওর বোনের বাঙালি বন্ধু যে বীণাকে বিনা বিনা বলে ডাকে, সে সব শুনতে শুনতে গুরপুর বলে একটা নদীর ব্রীজ পেরিয়ে নিউ ম্যাঙ্গালোর পোর্টের কাছে চলে এসেছি। বাঙালিদের হিন্দি ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে রসিকতা পরেও একাধিক বার শুনতে হয়েছে। অথচ কালক্রমে জেনেছিলাম এদের অল্পপ্রাণ মহাপ্রাণের উচ্চারণে বিচ্ছিরি গোলমাল আছে, ভারত হচ্ছে বারত, ঠান্ডা হয়ে দাঁড়াচ্ছে টান্ডা, লাভকে বলবে লাও। (লাও তো বটে, তবে আনে কে।)

ম্যাঙ্গালোর থেকে কারকালা অবধি প্রথম পঞ্চাশ কিলোমিটার সোজা রাস্তা, কারকালার পর বোজগোলি পার হবার পর থেকে পাহাড়ি পথের শুরু। রাস্তা ভাল, পাহাড়ি রাস্তার নিরিখে যথেষ্ট চওড়া। পথে বেশ কটা ঝরণা, জল বেশি নেই অবশ্য। ঘন্টা তিনেক পরে একটা ভারি সুন্দর জায়গার পাশ দিয়ে গেলাম। লাকিয়া নদীর ওপর বিশাল মাটির বাঁধ, সবুজ ঘাসের ওপর মেরুন রঙের পাতাবাহার দিয়ে লেখা নিকল। চোখ জুড়ানো সবুজ। একটু পরেই বাস থামলো আর হই হই করে কুদ্রেমুখা, কুদ্রেমুখা বলে আমাদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেলো। আমরা নেমে দেখি পাহাড়ে ঘেরা ছবির বই থেকে ছিঁড়ে আনা এক শহর। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঘর বাড়ি উঁকি মারছে। নিকল লেখা একটা জীপ দাঁড়িয়ে ছিল, তার পাশে একটা লম্বা চওড়া ভদ্রলোক, এগিয়ে এসে জানালো, ‘নায়ক ফ্রম অ্যাডমিন। জী. ই. টি?’

আমাদের আপাতত অতিথিশালায় থাকার জায়গা হলো।

অতিথিশালার নাম আগে ছিল প্রবাসী ভবন। প্রজেক্ট শুরু হবার সময় অনেক বিদেশী মাসের পর মাস কুদ্রেমুখে ছিল। তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দর জন্য সব সম্ভব ব্যবস্থা সমেত এই অতিথিশালা তৈরি হয়েছিল। তবে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে দেশি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা ছিল। তাদের জন্য ব্যাচেলার্স কর্ণার নামে কলেজ হোস্টেলের তুল্য সার্থকনামা একঝাঁক ঘর বানানো হয়েছিল। সাহেব বিবিরা কুদ্রেমুখ ছেড়ে যাবার পর, প্রবাসী ভবন যখন গোলামদের দখলে এলো, তখন তার নামের দেশি নামকরণ হলো সহ্যাদ্রি ভবন। কৌলিন্য না থাকলেও হাতির মৃতদেহের যে দাম যথেষ্ঠ তা তো ছোটোবেলা থেকেই জানা ছিল। আমাকে যেখানে থাকতে দেওয়া হলো সে ঘরটা ভালই। বেশ বড়, ছিমছাম, তবে সাজসজ্জায় আড়ম্বর কম, দেখাশুনোর ছাপও কম। বাথরুমটা বেশ বড়ো। আগে একটা বাথটব ছিল সেটা বোঝা যায়। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো ঘরের মধ্যে একটা দেড় তলা আছে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেই হলো। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, একে মেজনাইন ফ্লোর বলে। বিছানার ওপর বসে বেশ কিছুক্ষণ সামনের গলায় মেঘের মাফলার জড়ানো পাহাড়টার দিকে চেয়ে রইলাম। কিছু যেন একটা কম, বেশ কিছুক্ষণ পরে আবিষ্কার করলাম শব্দ নেই। সব কিছুই নির্বাক যুগের ছবির মতো চুপ, হাওয়াও চলে না, যে গাছের পাতা শুড়শুড়ি পেয়ে হেসে উঠবে। অতিথিশালার পিছে ভদ্রা নদী বয়ে যাচ্ছে, কান পাতলে অস্পষ্ট জলের আওয়াজ শোনা যায়। বিকেল হতে হতে মাথায় নিস্তব্ধতার কুয়াশা জমতে শুরু করল। একটা নাম না জানা কষ্ট নতুন চাকরি পাবার খুশির গলা টিপে ধরতে লাগলো। কেন যেন নন্দকুমারের ঘরে গিয়ে নিঃসঙ্গতা দূর করতে ইচ্ছে হলো না। ঘরে থাকতে অসহ্য লাগছিলো তাই বাইরে বেরিয়ে এলাম। অতিথিশালা থেকে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে দেখি একটা সুন্দর পার্ক, বেশ বড়, রাস্তার অন্য দিকে সারি দিয়ে কোয়ার্টার। পরে জেনেছি এখানে অনেক ধরনের থাকার ব্যবস্থা। প্রথম বিভাজন, সংসারী আর আইবুড়োর এবং তাতে আবার চার রকম এ, বি, সি আর ডি। সবচেয়ে বড় কোয়ার্টার ডি আর এক শোয়ার ঘর বিশিষ্ট ছোটো কোয়ার্টারগুলো-এ। এই প্রজেক্টের সীমানায় যারা আগের থেকে থাকতো, তাদের থাকার জন্য জামলে বলে একটা গ্রামে বস্তি করে দেওয়া হয়েছে। তারাই এখন প্ল্যান্টে খালাসির কাজটা করে। হাঁটতে হাঁটতে যে ব্লকটার সামনে এসে আমার পা আটকে গেলো সেটা সি এবং একতলার একটা ঘরের ভিতর থেকে উদাত্ত পুরুষ কন্ঠে রাগাশ্রয়ী বাংলা ভক্তিগীতি ভেসে আসছিল। কেউ হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছেন। গানটা চেনা নয়, আকর্ষণটা সুরের না ভাষার জানি না, তবে বোধহয় বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। গান থামলে একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাঙালি?’

চেহারায় প্রাদেশিক ছাপ সম্বন্ধে বিশেষ দক্ষতা না থাকলেও, আমাকে দেখে যে বাঙালি বলে চেনা যায় সেটা জানতাম। পরিচয় বিনিময় করে জানলাম অমল মুখার্জী এখানে অনেক বছর আছেন, কর্মস্থল সেন্ট্রাল স্টোর্স, গান গাওয়ার শখ পারিবারিক।

‘এবার আপনারা তো ভাই দু’জন বাঙালি এসেছেন, অন্যজন তো দু’দিন আগেই এসে গেছে। ওই ব্যাচেলার্স কর্ণারে উঠেছে। কলকাতার ছেলে, নাম ওই কর না কী যেন। গতকাল নাকি পালিয়ে যাচ্ছিল, বলে এখানে জোঁক, সাপ আর বাঘ, এ জায়গাটা নাকি থাকার যোগ্য নয়। আমরা এখানে কী থাকছি না, আপনিই বলুন। ভাগ্যিস ধরদা দেখতে পেয়ে, ওকে বাড়িতে এনে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখে দিয়েছে।’ ভাগ্যিস শব্দটির এমন অপপ্রয়োগ আমি জীবনেও শুনিনি আর সেই না দেখা ধরদার প্রতি আমার যে ভাব জন্মালো সেটাকে কিছুতেই শ্রদ্ধা বলা যাবে না। বিপদভঞ্জন করকে ধরে রেখে উনি নিজের অজান্তে নিকল তথা কুদ্রেমুখের যে কী ক্ষতি করলেন তার কোনও ধারণাই ওনার নেই। কুদ্রেমুখে সত্যি সত্যি বাঘ তো নেই, তাই সে সূত্রে ভালো কিছু হবার আশা রাখা বৃথা।

কথায় কথায় মুখার্জিদা বললেন, ‘ছিয়াত্তরের অক্টোবরে চাকরি নিয়ে কুদ্রেমুখে যোগ দিতে এসেছিলাম। কিছুই চিনতাম না। ব্যাঙ্গালোর থেকে আসার পথে কালাসা বলে এক জায়গায় রাতের জন্য থাকতে হয়েছিল। খাওয়ার জন্য শুধু চাপাতি আর চা। থাকার জন্য কিছু না।’ সেই চায়ের দোকান যার গাল ভরা নাম উদয়চন্দ্রিকা হোটেল তার মালিকের পরামর্শে এক হনুমান মন্দিরে রাত কাটাতে হয়েছিল। সকালে একটাকা ভাড়া দিয়ে কুদ্রেমুখে পৌঁছে ডঃ গিরি বলে একজনের খপ্পরে পড়তে হয়েছিল। উনি জ্ঞানদান করে পুরোনো হেলিপ্যাডের কাছে যে পাইলট প্ল্যান্টটা আছে সেখানে আপাতত থাকো বলে পাঠিয়ে দিলেন। তার মেঝেতে বিছানা বানিয়ে আরও কজনের সাথে এক সপ্তাহ থাকতে হয়েছিল। সে তুলনায় এখন তো অনেক ভালো।’

ওনাদের কোয়ার্টারে অনেকক্ষণ ছিলাম, মুখার্জী বৌদি মানে ওনার স্ত্রী সাথেও আলাপ হলো। ওনাদের এক মেয়ে, কারকালার কাছে নিট্টে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী, হস্টেলে থাকে। কুদ্রেমুখে কোনও কলেজ নেই, বারো ক্লাসই শেষ। তাই পড়া চালিয়ে যেতে সবার ছেলে মেয়েকেই কুদ্রেমুখে ছাড়তে হয়। বৌদি দাদা দুজনেই রাতে খেয়ে যেতে বললেন, আন্তরিকভাবে বলেছিলেন কিন্তু প্রথম পরিচয়েই পাত পাড়তে আমার কেমন যেন বাধলো। অতিথিশালার রাতের খাবার খেতে খেতে আমার চোখ খুলে গেল। অতিথি শালা কথাটি ভেঙে একটু আগে পিছে করলেই বোধকরি সত্য রক্ষা হয়।

নিকল থেকে নিয়োগপত্রের সাথে বেশ একটা মোটা ফর্ম পাঠিয়ে ছিল, আট দশ পাতার তো হবেই। তার ওপর বন্ড ইত্যাদি অনেক ঝামেলা ছিল। বাবা বারবার ফর্মটা পুরো ভালো করে পড়ে দেখে নিতে বলেছিলেন। আমার ধারণায় সবই ঠিক ঠাক করে এসেছিলাম কিন্তু রাতের বেলা কাগজপত্র গোছাতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো, ফর্মে আমাকে বেশ কবছর চেনেন বলে একজন গেজেটেড অফিসারের সার্টিফিকেট এখানে জমা দিতে হবে, সেটাতো করানো হয়নি। নিকল ভারত সরকারের উদ্যোগ হলেও পুরো সরকারি নয়। তাই কুদ্রেমুখে গেজেটেড অফিসার কেউ নেই, থাকলেও আমাকে বেশ কবছর ধরে চেনেন বলে সই করে দেবেন, এমন আশা করাটা বাড়াবাড়ি।

মাথায় ওই ঘুরতে লাগলো। সকালে ইডলি সাম্বার কী করে গলা দিয়ে নামলো কে জানে! কী জানি, কী বলবে ভাবতে ভাবতে পরদিন সকাল নটায়, নিকলের অফিসে পৌঁছে গেলাম। ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টের এক ঘরে আমাদের সবাইকে বসানো হলো। সব মিলে উনিশ জন, সর্বভারতীয় বিষম খিচুড়ি। একজন বাদে সবাই পুরুষ। একবার ভাবলাম ফর্মের অসুবিধেটা চেপে যাই, এত পাবলিক, এত কাগজপত্র, হয়তো চোখেই পড়বে না। আবার মনে হলো এই সব ফোঁটা কাটা লোকগুলো হেব্বি জিনিস হয়, ঠিক খুঁজে বের করে ঝামেলা শুরু করবে। ওদের হাতে ধরা পড়ার আগেই মিল্ক পাউডারের মত মুখ করে সততার পতাকা হাতে নিজেই বলে দিই, সেন্টু খেয়ে ছেড়েও দিতে পারে।

অর্ধেকটা শুনেই ট্রেনিং ম্যানেজার মিঃ গোবর্ধন আমাকে ৩০২ না ৩৭৫ ধারায় ফেলবেন তাই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আমি মিন মিন করে ভুল হয়ে গিয়েছে বলাতে, এমন ভাবটা করলেন, তা দেখলে এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়বার কেউ ভুল করতে সাহস পাবে না। আমার দুর্দশার আঁচ পেয়ে বিপদভঞ্জন কর খুশি চেপে রাখার চেষ্টাও করল না। ‘তুই শালা মায়ের ভোগে, তোকে নিঘ্ঘাৎ ফুটিয়ে দেবে।’ এতদূর আসার পর একটা কাগজে সই নেই বলে ফেরত যেতে হলে যাচ্ছেতাই হবে। অনেক ভেবে মিঃ গোবর্ধন আমাকে বসের কাছে নিয়ে যাওয়াই মনস্থ করলেন। স্কুলের পরে এমন প্রিন্সিপালের ঘরে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেক কাল ঘটেনি। ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান, বসন্তরাজ ভাট, নিজের হস্তরেখা দেখতে দেখতে মিঃ গোবর্ধনের উত্তেজিত বয়ান মাঝপথে থামিয়ে বললেন, ‘এই সব? ঠিক আছে, পনেরো দিন সময় দিন, কলকাতা থেকে আনিয়ে নেবে।’ গিরি গোবর্ধনকে অনায়াসে এক আঙুলে তুলে ওর বাধাদানের চেষ্টাকে ব্যর্থ করলেন। ‘কী পনেরো দিনে হবে তো?’ আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বললেন, ‘নিকলে স্বাগত।’

error: Content is protected !!