তুমি ও প্রেক্ষাগৃহ – সোমাদ্রি সাহা

0

তুমি এখনও কেন কথা বলো, নীরবে
কেন তুমি মৃত্যুর কথা বলতে বলতে
বাঁচার স্বপ্ন জাগিয়ে যাও ঘুমজাগানিয়া,
এসব ভেবেই তো কত রাত
না ঘুমিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি মাইক্রোফোনের সামনে।
জানি না হলে এখন কেউ লাইট জ্বালাবে কিনা,
কেউ এসে সিটে বসবে কিনা।
আমি বলতে শুরু করে দিয়েছি…ততক্ষণে
কী বলছি জানি না।
হঠাৎ দেখলাম হ্যালোজেনগুলো জ্বলে উঠছে
আমার আবহে সুর ভেসে আসছে…
‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো’
আমিও উদাত্ত কন্ঠে বলে চলেছি –
“অসদো মা সদ্‌গময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতম্‌ গময়
আবীরাবীর্ম এধি।”
“অসত্য হইতে মোরে সত্যে লইয়া যাও
আঁধার হইতে মোরে আলোকে লইয়া যাও
মরণ হইতে মোরে অমৃতে লইয়া যাও
হে আবি:, হে প্রকাশ, তুমি তো চিরপ্রকাশ,
একবার তুমি আমার হও, আমার হইয়া প্রকাশিত হও।”
তমসো মা জ্যোতির্গময় – প্রিয় উপনিষদ বাণী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

আসলে রবি ঠাকুর তো শুধুই কবি নন
উনি আমার প্রাণের ঠাকুর।
তবে আজকালকার উত্তরআধুনিকতা
রবি ঠাকুরকে ফিকে মনে করে।
রোজ বলে মার্কেজ পড়তে, মায়াকনোভস্কি পড়তে
জটিল জীবনকে সহজ করতে নাকি অ্যালিস মুনরো প্রয়োজন
আমি হাসি। আমি হাসতেই থাকি।
আমি এই ভারতবর্ষের যে ইতর রূপ দেখেছি
তাও সে সব নোংরা কদর্য থামিয়ে চিত্র মুছে দিতেই তোমরা
“ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা,”
বাজাতে শুরু করলে আমি সম্বিৎ ফিরে পাই।
বুঝতে পারি, আমার চেতনার বসন্ত তো হরণ করেছিল সময়
তবু আজও বসন্ত রয়েছে। থাকবে।
ঐ যে ছেলেটা চায়ের কেটলি হাতে তোমার সিটের পাশে
দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওর মা একজন বেশ্যা।
তবু ছেলেটি লড়াই করে পড়ছে,
ও স্কুলে যায়, মিড ডে মিলের জন্য নয়
ও একদিন নেতাজী হয়ে উঠবে…
উঠবেই।
আসলে মানুষ নিজের ভালবাসাকে দেখতে চায় ভালবাসার ভিতরে
তাই তো সাধারণ ভারতকে ইন্ডিয়া বানিয়ে তুলতে চায় সেলফি তুলে
অনেক আলো, অনেক মায়াবী হরিণী চোখ
আসলে ওরা শ্মশানের মৃত্যু কাঠ স্পর্শ করেনি,
এখন তো শহুরে চুল্লি। অনেক ফ্যাশান তোমাদের যাপনে।
আমি এসব সুযোগ পেলে অনেক বই পড়তাম।
রোজ লাইব্রেরি যেতাম।
হুম সে সব আর হলো কোথায়!
বুঝি। সবটাই বুঝি। আমার মানসিক ধর্ষিত শরীরের কথা
তোমরা শুনছো না।
তোমরা এলসিডি স্ক্রিনে আমার ম্যাট লিপস্টিক দেখছো
কানের ঝুমকো দুল দেখছো,
দ্যাখো।
ওসবগুলো দ্যাখো। তবে আমার মায়ের দেওয়া শাড়িটা দেখে
লোভ করো না।
মা বলেছিল, যেদিন আমি স্টেজে উঠব
সেদিন যেন এটা পরি।
পরেছি মা। তুমি তো অদূরেই আমার স্মৃতিতে আমার মননে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি। অজস্র শ্রোতারা উঠে দাঁড়াচ্ছে,
বিশ্বাস করুন আমি ওদের ‘জন গণ মন’ আবহ দিতে বলিনি
আমি এখনও শোনাতে চাই নারীর ধর্ষণের হাজার গল্প
অ্যাসিড হামলার করুণ ভয়ংকর যন্ত্রণা,
আপনার প্লিজ চলে যাবেন না।
একটু শুনুন…শুনুন প্লিজ
ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছি বাতিঘর।
প্রেক্ষাগৃহ শূন্য।
তুমি শুয়ে রয়েছো শবযানে, শকটের বাইরে আমি
একটা ঘোর, একটা সাদা বালিশের ভিজে যাওয়া
কানের হেড ফোনে এফএম বলে বেজে উঠল – মহিষাসুরমর্দিনী…
এবার কী তবে সত্য দুর্গা আসছে…
আসলে দুর্গা জন্ম বা মৃত্যু নেই
মৃত্যু হয় সাধারণের
আমার ভিতরে সেই অসাধারণ দুর্গা জ্যোতি রয়েছে
বুঝতেই পারিনি।
কেন পারিনি জানি না, তবে শিউলি ফুলের আঙ্গিনায়
তুমি পারলে একবার এসো বাবা,
তোমায় আরেকবার প্রণাম করতে চাই।

তুমি আমাদের তাচ্ছিল্য করে চলে গেছিলে বলেই
আমি আজ হাজার সন্তানের মা…

Leave a Reply

error: Content is protected !!