চারধাম যাত্রা : পর্ব ১ – সৌম্যেন কুন্ডা

0

“তারে একবার মন দিলে হায় রে, আর কি ফেরানো যায়?” সেই কবেই তো মন দিয়ে রেখেছি পাহাড়, নদী, জঙ্গলে। প্রায়শই ডাক শুনি। ডাক শুনি আর বসে রই, সবসময় যাওয়া তো আর হয়ে ওঠে না! অনেকদিন ধরেই ডাকছিল উত্তরাখন্ডের পাহাড়। বহুদিন আগে, ১৯৮৮/৮৯ এ গিয়েছিলাম হরিদ্বার, ঋষিকেশ, দেরাদুন, মুসৌরি। ২০১৯ এর মাঝামাঝি এসে ঠিক করলাম আরও একবার যেতেই হবে। যাবই যখন তখন কেদার-বদরী বাকি থাকে কেন? কেদার-বদরী গেলে যমুনোত্রী-গঙ্গোত্রীই বা কি দোষ করল? এইভাবে ঠিক হলো চারটি ধাম যাত্রা করতে চার সদস্যের দল যাবে।  আমি,আমার ছায়া সঙ্গিনী, সম্বন্ধী ও তার স্ত্রী। কেউ ষাট ছুঁই ছুঁই, কেউ ষাটোর্ধ্ব। প্রসঙ্গত বলে রাখি আমার স্ত্রীকে আমি ছায়া সঙ্গিনী বলি কারণ পারতপক্ষে আমাকে সে  একা কোথাও যেতে দেয় না। যাওয়ার দিন ঠিক হলো ১লা অক্টোবর ২০১৯ (লিখতে বসে মনে পড়ল এক বছর পর ২০২০ এর ২রা অক্টোবর আমি কোভিড আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম)। কোলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে ঋষিকেশে রাত্রিবাস, এমনটাই ঠিক হয়েছিল যিনি আমাদের গাড়ি ভাড়ায় দিয়েছিলেন সেই অরুণ আগরওয়ালের সাথে। কোলকাতা থেকে আমাদের ফ্লাইট সকাল সাতটায়। পাঁচটা নাগাদ বিমানবন্দরে পৌঁছে এয়ার ইন্ডিয়ার চেক ইন কাউন্টারে ঘন্টা খানেক লাইনে দাঁড়ানোর পর,আমাদের কাছে বৈধ টিকেট থাকা সত্ত্বেও, বলা হলো ফ্লাইটে জায়গা নেই! প্রচুর বাগবিতন্ডার পর ওনারা ব্যবস্থা করতে পারলেন এবং আমরাও কোনরকমে সময়ের মধ্যে সিকিউরিটি চেক সাঙ্গ করে ফ্লাইট ধরতে পারলাম। এতদিনের যাতায়াতে এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম। দিল্লি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল আমাদের সারথী অজয়, অজয় কুমার  প্রজাপতি। ১ তারিখে দিল্লি বিমানবন্দর থেকে তুলে নিয়ে সব জায়গা ঘুরিয়ে ১২ অক্টোবর ফের এখানে নামিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব অজয়ের। ল এবং ন এর উচ্চারণে একটু অসুবিধা আছে অজয়ের। বারো দিনের যাত্রা পথে লক্ষ্ণৌকে নক্ষ্লৌ-ই বলে গেল। লোককথায় পারদর্শী এবং সুদক্ষ চালক অজয়। রাস্তায় একবার দুপুরের খাওয়া আর  ঢোকার মুখে লম্বা জ্যাম মিলিয়ে প্রায় ছয় ঘন্টা লেগেছিল ঋষিকেশ পৌঁছাতে। শহরের পরিকল্পনাহীন বিস্তৃতি দেখে মনটা একটু খারাপই হলো। হরিদ্বার, ঋষিকেশ, লছমন ঝুলা প্রায় এক শহরে পরিণত হয়েছে। অরুনজীর পরামর্শ অনুযায়ী এক অতিথিশালায় রাত কাটানোর ব্যবস্থা হলো। হোটেলের সব সুবিধাই আছে শুধু (১) রুম সার্ভিস নেই আর (২) খাওয়ার জায়গা একতলায়,সব রান্না পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া, তাতে কোনও অসুবিধা হয়নি আমাদের। মালপত্র রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে গেলাম চারধাম যাত্রায় অতি আবশ্যক বায়োমেট্রিক পঞ্জীকরণ করাতে। ফিরে এসে নীচে কফি খেতে খেতে অরুনজী এলেন। সাক্ষাতে কথাবার্তা এই প্রথম, গত কয়েক মাস ধরে টেলিফোনেই কথা হয়েছে। অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। আমাকে বরাবর বলে এসেছেন “আপনারা যে সময়ে আসছেন সে সময়ে খুব ভিড় হবে না। কাজেই খামোখা বেশি পয়সা দিয়ে এখনই হোটেল বুক করবেন না। প্রতিটি জায়গায় নিজে দেখে হোটেল ঠিক করবেন।” সঠিক পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমরা ছিলাম তিন তলায়। সকাল সকাল উঠে হোটেল সংলগ্ন বাগানে ঘুরতে গিয়ে দেখি কয়েকধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে একটি দরজার দিকে। কৌতূহল হলো। দরজা খুলতেই দেখি সামনে রাস্তা আর তার পরেই বয়ে যাচ্ছে গঙ্গানদী। কি যে শান্ত সুন্দর দৃশ্য তা আমার অক্ষম লেখনী বলে বোঝাতে পারবে না। গঙ্গার পার ধরে খানিক হাঁটাচলা করে রুমে ফিরে এলাম, আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে রওনা হব  বারকোটের উদ্দেশ্যে, দূরত্ব কমবেশি ১৭০কিমি। জলি গ্রান্ট (দেরাদুন) বিমানবন্দরের কাছাকাছি দিয়ে গেলাম। এই বিমানবন্দরটি নামে দেরাদুন হলে কি হবে দূরত্বের হিসেবে ঋষিকেশের বেশি কাছে! বিকেল তিনটে নাগাদ পৌঁছে বারকোটের গারোয়াল মন্ডল বিকাশ নিগমের ট্যুরিস্ট লজে জায়গাও পেয়ে গেলাম। তবে মে জুনে এলে আগে থেকে বুকিং করে আসাটাই বাঞ্ছনীয়। ছাতা ছিল সঙ্গে, তবুও অজয়ের পরামর্শ মেনে বারকোটের বাজার থেকে পলকা রেইনকোট (একবার ব্যবহার যোগ্য, যতদূর মনে পড়ছে একটির দাম ২০ টাকা) কেনা হলো। যমুনোত্রী থেকে ফেরার পথে কাজে দিয়েছিল বেশ। খাওয়া দাওয়া (এখানে ডিম পাওয়া যায়) সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পরলাম, সকালে যাব যমুনোত্রী। বলা হয় যমুনা নদীর উৎস, কিন্তু আসল উৎপত্তি স্থল আরও প্রায় ১২০০মিটার উঁচু এক দুর্গম জায়গায়। প্রথম মন্দির স্থাপনা করেন টেহরির রাজা প্রতাপ শাহ। পরে ১৯এর শতকে জয়পুরের মহারানী গুলেরিয়া বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পরেরদিন অর্থাৎ ৩ অক্টোবর সকাল সকাল রওনা দিয়ে দশটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম জানকী চট্টি। রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। পঁয়তাল্লিশ কিমি যেতে প্রায় দুঘন্টা লাগলো। রাস্তা চওড়া করার কাজ চলছে, চার ধামের জন্য। প্রায় ছয় কিলোমিটার হেঁটে উঠতে হবে যমুনোত্রী(উচ্চতা ৩২০০মিটার মত, GMVN এর Map আর গুগল দুরকম বলে, আমি মধ্যপন্থা নিলাম)। ঘোড়া ভাড়া করাই শ্রেয় মনে হলো, এবং নেওয়াও হলো। দুটো ঘোড়া আর দুটো ছোটো ঘোড়া শ্রীমতীদের জন্য। এমনিতে রাস্তা ভালো কিন্তু মাঝমাঝেই খাড়াই (এতটাই খাড়া যে ঘোড়া না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হতো) এবং কোথাও কোথাও চোখ কান খোলা না রাখলে মাথা ঠুকে যাওয়ার সম্ভাবনা। দূর থেকে মন্দির দেখেই যাত্রীরা নানারকম ধ্বনি দিচ্ছিলেন। নেমে আসা যমুনা নদীর বাঁ দিকে যমুনোত্রী। পুল পেড়িয়ে পৌঁছে গেলাম মন্দিরের কাছে। পান্ডাদের ভিড় ছিল তবে তেমন কিছু নয়। আমাদের পান্ডা নিয়ে গিয়ে এক উষ্ণ প্রস্রবনের সামনে বসিয়ে পূজা পাঠ করে একটি থলির মধ্যে চাল দিয়ে সেটি গরম জলে চুবিয়ে রাখলেন এবং পূজোর শেষে তুলে আধসেদ্ধ চাল প্রসাদ হিসেবে দিলেন। এই আধসেদ্ধ ভাত/চাল প্রসাদ হোটেলে ফিরে খুলে শুকিয়ে রাখলে বাড়ি ফিরে প্রিয়জনদের দেওয়া যায়, নইলে ছাতা ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সোয়া ঘন্টাটাক ঘোড়সওয়ারী করে দেখেছিলাম সবার কোমর খুব বিরক্ত, তাই হেঁটে ফেরার/নামার সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন অবশ্য খেয়াল ছিল না যে হাঁটতে হবে গাড়ি অবধি অর্থাৎ আরও এক কিলোমিটার বেশি। মন্দির থেকে বের হয়ে খুব বাজে পুরী সব্জি খেয়ে, বৃষ্টি আর হাওয়ার সাথে হাঁটতে হাঁটতে হাক্লান্ত অবস্থায় ফিরে এলাম জানকী চট্টি। এরপর অনভ্যস্ত পায়ে দুদিন ভোলিনি মালিশ করতে হয়েছিল, তাও ব্যথা যেতে চায় না। তবে রাস্তায় মাঝে মাঝেই ঘোড়া দাঁড়িয়েছিল ফিরতি সওয়ারীর জন্য, ইচ্ছে করলে নেওয়াই যেত। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে বেশ ভালো লাগলো, অচেনা মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং নির্দ্বিধায় সেই হাত ধরে টেনে তোলা। ফিরতি পথে কতজনের বাড়ানো হাত যে আমরা ধরেছিলাম তার ইয়ত্তা নেই। যারা হেঁটে উঠছেন তাদের ক্লান্ত স্বরের প্রশ্ন একটাই “অউর কিতনা দূর”, উত্তরেও সবাই  একই কথা বলছিলেন “ব্যস, থোড়ি সি অউর”। ভালো লাগলো যমুনোত্রী। অবসন্ন শরীরে ট্যুরিস্ট লজে ফিরে এসে খাওয়া, ঘুম। কাল ধীরে সুস্থে রওনা হব উত্তর কাশীর উদ্দেশ্যে।

দিল্লি থেকে যমুনোত্রী অবধি তোলা কিছু মন রেখে আসা মূহূর্তের ছবি রইল এখানে।

যমুনোত্রী থেকে ফিরে রাত কাটালাম বারকোটে। পরের দিন সকালে উঠে রওনা তবে ধীরে সুস্থে তৈরি হয়ে, এবার গন্তব্য উত্তরকাশী। বারকোট থেকে ব্রহ্ম খাল, ডুন্ডা, মাতলি হয়ে উত্তরকাশি। দূরত্ব প্রায় ৯০কিমি।রাস্তায় মনমতো খাওয়ার পাওয়া একটু মুশকিল। যেখানে খেতে বসেছিলাম সেই দোকানের মালকিন আমাদের বিলে অন্য টেবিলের চা, বিস্কুটের দাম (১৭০টাকা) জুড়েই ছাড়বেন এরকম একটা অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন। আম্মো ছাড়ব না। নেহাৎ ওনার ছেলে এবং যিনি চা-বিস্কুট নিয়েছেন তিনি এসে যাওয়ায় সন্ধি হলো। এখানে একটা কথা বলা ভালো। জিনিসপত্রের দাম উচ্চতার সাথে প্রায় সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। ডুন্ডা এসে দেখা মিলেছিল ভাগিরথীর। এই দেবভূমির কাশী, উত্তরকাশী (উচ্চতা ১১৫৮মিটার, এখানে GMVN এর Map আর গুগল দুজনেই একই বলছে)। বারাণসীর উত্তরে অবস্থিত বলে এর নামকরণ করা হয়েছে উত্তর কাশী। সৌম্য বারাণসীও নাকি বলা হয় স্কন্দ পুরাণে, এমনই পড়েছিলাম কোথাও। ভুল হলে শুধরে দিও। বিশ্বনাথ এর মন্দির, মনিকর্ণিকা ঘাট সব পাবে এখানে, যেমনটি আছে কাশীতে। কেউ বলেন কলিযুগের দ্বিতীয় পর্যায়ে ডুবে যাবে বারাণসী তখন বিশ্বনাথ উঠে আসবেন উত্তর কাশীতে। কথিত আছে ঋষি পরশুরাম তৈরি করেছিলেন এই মন্দির। ১৮৫৭ সালে পুরানো মন্দিরকে নুতন করে সাজান টেহরির মহারানী খানেতি। এই দেব ভূমিতে লোকগাথা ছড়িয়ে রয়েছে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, ঝর্ণা-নদীর প্রতিটি জলকণায়,  অটুট বিশ্বাস বইছে তরতাজা বাতাসে। যেমন কিনা বিশ্বনাথের মন্দিরের মুখোমুখি শক্তি মন্দির। মন্দিরের ছাদ ছাড়িয়ে ওঠা বিশাল এক ত্রিশূল(৬মিটার উঁচু আর ভূমির কাছে ৯০ সেমি ব্যাসের লোহা ও তামা দিয়ে তৈরি) পূজিত হয় এখানে। ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাস দেবী দুর্গা এই ত্রিশূল ছুঁড়ে মেরেছিলেন অসুরদের। যারা বিশ্বাস করেন না তারা অন্য কথা বলেন। এখানে কখন যেন দেবতা,পাহাড়, ঝর্ণা-নদী সব এক হয়ে যায়, এক মুগ্ধতার আবরণ ঘিরে থাকবে তোমায়, বিশ্বাসে বা অবিশ্বাসে। তুমি থাক তোমার বিশ্বাস (দেবতা আছে এ এক বিশ্বাস, আবার দেবতায় অবিশ্বাস ও এক বিশ্বাস) নিয়ে, লোকগাথায় ছিদ্র খুঁজতে যেওনা যেন। যারা বলছেন তারা কষ্ট পাবেন। শহরে ঢুকেই প্রথমে মন্দির দর্শন, পূজা ইত্যাদি সেরে নিয়ে শহর থেকে একটু বাইরে নদীর পাড়ে ঘর নিলাম শান্ত পরিবেশে। গঙ্গোত্রীর দিকে একটু এগিয়েও থাকা গেল। দুপুরে যখন পূজা দেওয়া হলো তখন শক্তি মন্দিরের পূজারী শ্রীমতীদের হাত ভরে সিঁদুর, ধূপ আর শুকনো প্রসাদ দিয়েছিলেন। দিনে তেমন ঠান্ডা ছিল না তবে সন্ধ্যায় আরতি দেখতে মন্দিরে গিয়েছিলাম ফুলহাতা সোয়েটার গায়ে দিয়ে। সন্ধ্যার রাস্তায় খুব কম সংখ্যক মানুষ ছিলেন। দলের বাকি তিনজন আরতি দেখতে গেলে আমি আশপাশে ঘুরতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম সামনের বড়ো দোকানের মিষ্টি বেশ ভালো। টিপ টিপ বৃষ্টি আর হাওয়ার সাথে ঠান্ডা অল্প অল্প বাড়ছিল। রাতে হোটেলে ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে নদীর গান শুনতে শুনতে ঘুম। সকাল সকাল উঠে যেতে হবে গঙ্গোত্রী, সপ্তমীর দিন।

Leave a Reply

error: Content is protected !!