ভোরের স্বপ্ন – মধুপর্ণা বসু

0

অনিমা বার বার চেঁচিয়ে ডাকছে, ‘পিকু পিকু, ওদিকে যাস না, পড়ে যাবি, পিকুউউউউ… ’ হঠাৎ গায়ে ধাক্কায় ঘুমটা ঝট করে ভেঙে গেল অনিমার, মুখটা অল্প ঘেমে উঠেছে, ‘অনিমা দি, কি হয়েছে?  কাকে ডাকছিলে? মুখ থেকে কেমন গোঁ গোঁ করে আওয়াজ হচ্ছিল, কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছো দিদি? ‘কোনরকমে নিজেকে সামলে অনিমা উঠে বসলেন, পাশে দাঁড়িয়ে রমা, রমা মাসি বলে সবাই। অনিমার থেকে কিছু ছোট,  তাই তাকে দিদি বলে রমা।
তা প্রায় দুবছর হল রমা এখানে এসেছে। এখানে মানে সন্ধ্যারাগ বৃদ্ধাশ্রমে।  এক মেয়ে ধানবাদে থাকে, সেই রমার বৃদ্ধাশ্রমের খরচা দেয়, শ্বশুর বাড়ির ঝামেলায় সাথে নিয়ে যাবার উপায় নেই যে। প্রথমে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে অনিমা বললো, ‘হ্যাঁ গো, ওই একটা স্বপ্নে, মানে খারাপ স্বপ্ন, উফফ, ভাগ্যিস ডাকলে,’ ‘বুঝেছি, নিশ্চয় তোমার ছেলেকে নিয়ে কিছু দেখেছো, আমাদের তো ওই, পেটের সন্তানরা সব হোমে দিয়ে কর্তব্য সেরেছে, আর আমরা ভেবে ভেবে হালেকান হইগো।’
অনিমা কিছুটা ইতস্তত হয়েই বললো, ‘নাগো, আমার পিকু তেমন নয়, আমিই তো জেদ করে গেলাম না, ওদের সাথে, ওই বিদেশ বিভূঁইয়ে, ওদের জীবন, আদবকেতা, ওসব যে আমার সইবে না, তাই তো এই ব্যবস্থা, কি আর করবে বলো, অতো বড় চাকরি তো আর এই বুড়ির জন্যে…’
        আজ বেশ দেরি হয়ে গেছে, অনিমা তাড়াতাড়ি উঠে সকালের কলঘর, চান, সেরে রোজের মতো বাগানের ফুল তুলে রাধাকৃষ্ণের পায়ে দিয়ে, খাবার ঘরে গিয়ে নিজের চা, আর ঘরে রাখা বিস্কুট খেয়ে, কাজের লিস্টে চোখ বোলালেন। পুজোর পর এই সময়টায় মনটা বড় খারাপ হয়ে যায়, ছয় বছর আগেও সব অন্যরকম ছিল, বাড়িতে লোকজনের আসাযাওয়া, বিজয়া পর্ব, আর পিকুরা তখন নিয়ম করে আসতো পুজোর ছুটি নিয়ে। তারপর পিকুর বাবার হঠাৎ চলে যাওয়া, অনিমার একা থাকার নানা অসুবিধেতে পিকুকে বছরে তিনচার বার আসতে হতো। অনিমা ছেলের এই হয়রানি আর দেখতে পারছিল না, শেষে নিজেই বলে বসলেন,
‘পিকু, এক কাজ কর, এই বাড়িটা বিক্রি করে, আমাকে একটা ভাল  হোমে ব্যবস্থা করে দে বাবু, এই টাকা থেকেই আমার চলে যাবে, আর ওখানেই ছোট খাটো কিছু কাজকর্ম…’ সেতো ছেলে কিছুতেই রাজি না।
‘লোকজন নিয়ে এখানেই  থাকো, আমি তো আসিই বছরে দু’বার।’
অনেক তর্কাতর্কির পর সেই ব্যবস্থাই হল, যদিও অনিমা জানেন, এতে ছেলের খুবই ভালো হয়েছে। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল৷ ওই বছরে একবার, কি খুব জোর দুবার প্লেনের খরচা লাগে ছেলের তার কাছে আসার। দু তিনদিন এখানের কোন গেস্ট হাউজে থেকে, মায়ের দেখাশোনার খবর নেয়, ব্যাঙ্কের কাজ, কিছু ফরম্যালিটি সেরে নিজের জগতে ফেরে। মাঝেমধ্যে ফোন, আর খুব মন কেমন করলে, গভীর রাতে ভিডিও কল করে পিকু, দিশা, আর নাতনির সাথে কথা, ইদানীং তাও কমে গেছে। ওদেশে সবারই কাজের চাপ আর টাকা রোজগারের কেমন যে নেশা। মাঝে মাঝে এখন অনিমার চিন্তা হয়, সত্তরের কোঠায় হল বয়েস। আর কতদিন?  সুস্থ থেকে নিজের ভার নিজে নিতে পারবে তো ? কোনদিন মৃত্যু এসে ডেকে নিয়ে যাবে, সামান্য চোখের দেখাও হয়েতো হবেনা, ছেলে, বউ টিনার সাথে। এবারও নিয়ম করে ওই দেওয়ালীতে মিষ্টি আর কার্ড আসবে। আর ভালো লাগে না, এই লম্বা জীবন কোনদিন একা বহন করতে হবে ভাবেই নি। ছেলে মেয়েরা যোগ্য হলে এইভাবেই কি তাদের বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে হয়? কিছুই কি কাছে রাখার কোন অধিকার নেই?
রাতে বসে বসে কতো কথা ভাবছিলেন অনিমা, কি করে আতুপুতু করে পিকুকে মানুষ করেছিলেন। আর আজ সে চল্লিশে পৌঁছেই কতো সফল হয়েছে, আর ছেড়ে গেছে একটু একটু করে মায়ের আঁচল। দূর থেকে দূরাগত আজ সম্পর্ক আর ভালোবাসার রক্তের ঋণ।
আর কদিন পর কালী পুজো, প্রতিবার এই সময় পিকুর ফোন আর গিফট আসে। এবার তো? কই? এখনো এলো না কিছু? কাল সকালে কি একবার ফোন করে খোঁজ নেবে?
অনিমার ফোনে খরচা হয় বলে পিকু খালি বলে ওইই ফোন করবে, দূর ভালো লাগে না, কাল একবার…. তারপর গতকালের রাতে স্বপ্নটা,  সেই থেকে মনটা কু গাইছে।
আজ অনিমা বেশ তাড়াতাড়িই উঠে পড়েছেন। এখন পিকুদের সন্ধ্যে, সকালের খাবারের আগেই ফোনটা নিয়ে বসেছেন। আঃ, এ তো জ্বালা, হল, খালি বলছে, নট রিচেবেল,  এ আবার কি, এখন তো সন্ধ্যে ওদের, আচ্ছা আবার একবার…
না হচ্ছে না তো। এবার অনিমার বুকের ভেতর কেমন যেন করতে লাগলো,  একি, ফোন যাচ্ছে না কেন? বাজে স্বপ্ন, ফোন না পাওয়া, কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে, বুকের ভেতর ধপধপ করছে, রমা কে ডাকবেন? শরীরটা যেন কেমন, থরথর করে কাঁপছে।
‘রমা, রমা, রমা? আছো? ‘রমা প্রায় হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে, ‘ও অনিমাদি, অনিমাদি? কি হল? কিগো? তোমার মুখটা এমন কেন? বিশ্বাস হচ্ছেনা বুঝি?’
‘কি, কি বিশ্বাস হবে? কি হয়েছে? কি বলতে চাইছো, রমা?’ অনিমার গলার স্বর আর বেরোচ্ছে না। মুখটা সাদা রক্তশূন্য হয়ে গেছে যে।
রমা খুব কাছে এসে অনিমাদিকে জড়িয়ে ধরে ফেলে বললো, ‘আরে দিদি, ভয় এমন করছো কেন? এতো চমক গো অনিমাদি, তোমার ছেলে এসেছে যে, সাথে বউ, নাতনী। ‘বলে অনিমাদিকে প্রায় জড়িয়ে ধরলো। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা তাঁর। পিকু, বউমা, এই অসময়ে, দেশে? কি হলরে বাবা? কিছু বিপদ আপদ হল? গলার স্বর কেঁপে গেল অনিমা রমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায়?’বলে অফিসের দিকে পা বাড়ালেন, কেমন যেন টলে গেল, পা টা।
‘হ্যাঁ গো, অফিসেই কথা বলছেন, খুব ভালো লাগলো গো, চলো চলো তুমি।’
অনিমা কিছুটা চিন্তা আর তাড়া নিয়ে এগোতে এগোতেই বাগানের মাঝে থমকে গেলেন। পিকু  দিশা, আর তাদের আগে আগে টিনা, আসছে। অনিমাকে দেখে টিনা ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরলো অনিমাকে, ‘সারপ্রাইজ, সারপ্রাইজ, ঠামি, কি কেমন দিলাম বলো? বাবা বলেছিল, তোমায় জানাবে, আমিই বলেছি, না, কক্ষোনো না, একেবারে সামনে গিয়ে কোলে চড়বো।’ দিশা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘আর কিন্তু কিছু শুনছিনা মামনি, এবার কিন্তু আমরা তৈরি হয়েই এসেছি।’
অনিমার মাথায় ঢুকছেনা কিছু,  কি বলছে দিশা, ‘কি বলছিস কি? কি হয়েছে, কি ব্যাপার পিকু?’
‘ও কি বলবে মামনি, এবার তোমার এ দেশের পালা, আপাতত শেষ,  তুমি আমাদের সাথে স্টেটস যাচ্ছো। শোন শোন, এখুনি হাঁউমাউ করবে না, শোন দুচারটে বছর আমাদের সাথে স্টেটস এ কষ্ট করে থাকতে হবে, ওই আরবকি, মদ, মাংস, টয়লেট পেপার, হিহিহি, এসব সহ্য করতে হবে, তারপর…’ দিশা চোখ মিটমিট করে পিকুর দিকে তাকালো।
‘তারপর ভাবছি,’ বলে মাকে জড়িয়ে ধরলো পিকু,  ‘আমাদের এই নুনে পোড়া দ্যাশেই বুড়ো বয়েসটা একসাথে তোমার সাথে জমিয়ে রসে বশে, মাছ ভাত খেয়ে থাকবো, কি বলো?’
এসব কি বলছে পিকু? কি ব্যাপার?  কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা অনিমা, ওদেশে কি কোন বিপদ আপদ হল? সন্দেহের চোখে তাকাতে পিকু বললো, ‘এতো গোয়ান্দার মতো দেখার কিছু নেই মাতা, এসব অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম,  নানারকম চেষ্টা করে, দিল্লী, বা ব্যাঙ্গালোরে আমার কাজের সেটআপ হচ্ছে। কিন্তু আরো বছর দুএক লাগবে, আর আমরা ডিসিশন নিয়েছি, তুমি আর একদিনও এই বৃদ্ধাশ্রমে না, আমাদের সাথে ভিনদেশের বাসিন্দা হবে। কিরে? টিন, হয়েছে তোর কাজ?’
‘ইয়েস বাবা, অল ডান।’ টিনা পাকা গিন্নীর মতো বললো।
টিনা ঠাম্মার সব জিনিসপত্র রমার সঙ্গে প্যাক করে ফেলেছে দুটো সুটকেসে। অনিমা যেন কেমন স্থবির হয়ে গেছেন, যেন সব কিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। কি বলবেন, কি করবেন, কিছু যেন তার মাথায় আসছেনা। জোর করে, জেদ করে থেকে যাবার ক্ষমতা আর ইচ্ছেও যেন নেই। স্বামী মারা যাবার পর যে জেদ ছিল আজ ছয় বছর পর যেন সেটাও চলে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে ছেলে বউ আর নাতনির দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন।
দিশা মাকে জড়িয়ে ধরে ‘না মা, একদম না, একদম কান্নাকাটি না,’ পিকু বললো কাঁধটা ধরে ‘তোমার সত্তর পার হয়েছে মা, আর আজ আমি চাকরিতে আমার নিজের জোরটা খাটাতে পারি। তোমার ছেলে এতো অমানুষ হতে পারবে না। তুমি যে আমার মা, তার ছেলে খারাপ কি করে হবে বলো? হ্যাঁ, একটা সময় হাত পা বাঁধা ছিল, আজ আর নেই, মা। আর আমরা চাই টিন এই দেশের ভালো মন্দ, দুঃখ, কষ্ট গুলো জেনে বুঝে, শিখে বড় হোক। তোমার পাসপোর্ট ভিসা সব ব্যবস্থা করতে কদিন লেগে গেছে। তাই আপাতত তুমি আমাদের জিম্মায়, এরপরে আমরা আবার তোমার জিম্মায় থাকবো।’
টিনা, দিশা, জিনিসপত্র আগেই ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়েছে। আসলে ওরা দুদিন আগেই এসেছে, কলকাতা। অনিমাকে জানতে দেবেনা বলে ফোনে কারসাজি। টিনা গিয়ে গাড়ির দরজা টা খুলে দাঁড়ালো,  আর পিকু অনিমার হাত ধরে এগিয়ে চললো গেটের দিকে।
অনিমা, যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখলো তার গত পাঁচ বছরের আশ্রয় সন্ধ্যারাগের দিকে। এবার আবার অন্য দেশ, অন্য সমাজ, অন্য সব কিছু। তাহলে সব ভোরের স্বপ্ন খারাপ হয়না। এমনও হৃদয় জুড়ে প্রাপ্তিও  অপেক্ষা করে কোথাও কারো জন্যে। গাড়ি ছুটে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে…
আর আমি খুঁজছি ব্যাকুল হয়ে পিকুকে, দিশা আর টিনা কে… সব কৃতি ছেলে মেয়েরা এমন হয় না কেন?

Leave a Reply

error: Content is protected !!